কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) দ্বন্দ্ব। তাদের প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগদান এবং সংগঠনের গোপনীয়তা ফাঁস ঠেকাতে ভীতি সঞ্চারের জন্য দলছুটদের খুন করছে পরস্পর দুই গোষ্ঠী। সাবেক সদস্যদের দলে নেয়ায় প্রতিপক্ষ আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সাথে দ্বন্দ্বের কারণেও দুই পক্ষ সংঘর্ষ বেড়ে চলেছে। এ দিকে স্থানীয়দেরকে দিয়ে স্থানীয়দের অপহরণ করছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এমন অভিযোগও রয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, তাদের প্রতিবেদন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও থানা সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র বলেছে, সম্প্রতিক বিভিন্ন ক্যাম্পে খুন হওয়া রোহিঙ্গার বেশির ভাগই আরসার সাবেক সদস্য। সুবিধাবঞ্চিত হয়ে তারা সংগঠনটির প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার ওরফে জুনুনির ওপর আর আস্থা রাখতে পারেনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন আরসার একক আধিপত্য ছিল। কিন্তু আরসা ছেড়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দলে ভিড়িয়ে আরএসও অবস্থান শক্ত করেছে। এ নিয়েও দুই সংগঠনের দ্বন্দ্বে খুনোখুনি বেড়েছে। জানতে চাইলে উখিয়া থানা ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, কে আরসা, কে আরাকান আর্মি, সেটা কোনো বিষয় নয়। আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে দেবো না। সেখানে যারাই অপরাধে জড়াবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ ছাড় পাবে না। ক্যাম্পে এপিবিএন পুলিশও কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ক্যাম্প থেকে সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করতে কাজ সমন্বিতভাবে করছে প্রশাসন।
কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এর মাঝি আবু সালেহ বলেন, ক্যাম্পগুলোর প্রধান মাঝি ও আরসার মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক পুরাতন। এ দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ আরসার ছায়াতল থেকে সরে আসার চেষ্টা। মাদক, অপহরণ, গুম, মুক্তিপণের টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। এসব কারণে আরসা অনুসারী মাঝিরা সংগঠন থেকে সরে এসেছেন।
এরই মধ্যে উখিয়ার বালুখালী ৯ নম্বর ক্যাম্পে নূর হাবি ওরফে ডা: ওয়াক্কাস (৪০) নামে এক রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি আরসার সক্রিয় কমান্ডার ছিলেন। এপিবিএন বলেছে, ক্যাম্পের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায়ও তিনি ছিলেন। গত মাসে বালুখালী ৮-ইস্ট রোহিঙ্গা শিবিরে ‘আধিপত্য বিস্তার’ নিয়ে সশস্ত্র দু’টি গোষ্ঠীর সংঘর্ষে দুই রোহিঙ্গা নিহত ও একজন গুলিবিদ্ধ হয়। তারাও আরসার সাবেক সদস্য।
১৪ এপিবিএন পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, আরাকান স্যালভেশন আর্মি ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারের কারণে শুধু তারাই নয়, অনেক সাধারণ রোহিঙ্গাও নিহত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে।
কিছু দিন আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হন। এপিবিএন বলছে, তিনি আরসা কমান্ডার। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র-গুলিসহ আরসার তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আরসা-আরএসও দ্বন্দ্বের কারণ
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, আরসা ও আরএসও সদস্যরা কোনারপাড়া শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। পরে তা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ছড়িয়ে পড়ছে। তমব্রু সীমান্তে শূন্যরেখায় গোলাগুলিতে আহত আরএসও সদস্য মুহিব উল্লাহর দাবি, ২০১৮ সাল থেকে টানা তিন বছর মিয়ানমারের পাহাড়ি এলাকায় তারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের সংগঠনের লক্ষ্য ‘আরকানের স্বাধীনতা’। নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো ইউনিট মনে করে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসার অস্তিত্ব নেই। আবার কারো কারো মতে, শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল সংগঠনটি। তবে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ খুন হওয়ার পর আরসার অপতৎপরতার বিষয়টি উঠে আসে।
অন্য একটি সূত্র বলেছে, মুহিবুল্লার খুনের পর বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে ৪৬৭ জন কথিত আরসা সদস্যকে গ্রেফতার করেছে এপিবিএন। এপিবিএন সূত্র বলছে, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মোট ৩৪টি ক্যাম্পের সব ক’টিতে আরসা সক্রিয়। এর সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার। তবে আরসার প্রধান গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের সদস্য ১৬ হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত আরসার ১০ কমান্ডারের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা হলেন আলি জোহর, হোসেন জোহর, জয়নাল, মো: সেলিম, আয়াত উল্লাহ, বশির উল্লাহ ও ওবাইদ উল্লাহ। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন আলমগীর, মৌলভি মোস্তাক, ওস্তাদ খালেদ ওরফে খালিদ ও ইব্রাহিম। ক্যাম্পে যারা খুন হয়েছেন তাদের বেশির ভাগই ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। প্রথম দিকে আরসার জড়িত থাকা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সম্প্রতি দুই নেতা, তিন মাঝি, ছয় মুসল্লিসহ অন্তত দুই ডজন খুনে সরাসরি আরসা জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে আরএসওর নামও এসেছে।
কয়েকটি ক্যাম্পের নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক হেড মাঝিরা অভিযোগ করেন, ক্যাম্পে রাতে ভারী ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় একটি গ্রুপ। এরা প্রতিটি ব্লকে গিয়ে যুবকদের তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দিতে বলে। কাউকে কাউকে যোগ দিতে বাধ্যও করে।
গত মঙ্গলবার নিহত ১ : গত মঙ্গলবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্বৃত্তের গুলিতে মোহাম্মদ ইউনুছ (১৮) নামে এক রোহিঙ্গা কিশোর নিহত হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উখিয়া ক্যাম্প ৮- ডব্লিউ বি ব্লকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ইউনুছ একই ক্যাম্পের মো: হামিদ হোসেনের ছেলে। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, মিয়ানমারের সশস্ত্র গ্রুপ আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত কিশোর ক্যাম্প ৮/ইস্টের হাফিজিয়া মাদরাসার ছাত্র ছিল। সোর্স সন্দেহে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে তাদের ধারণা। বিষয়টি নিশ্চিত করে ১৪-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পুলিশ সুপার মো: সাইফুজ্জামান জানান, একদল দুর্বৃত্ত অন্ধকারে ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় গুলিবিদ্ধ কিশোরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসার কর্মকাণ্ড নিরাপত্তার জন্য হুমকি
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছাড়াও আশপাশের এলাকায় অপহরণে জড়িয়ে পড়েছে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান নিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে মিশে আরসা সদস্যরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে এবং নিজেদের শক্তি বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু অপহরণ নয়, অস্ত্র ব্যবসার সাথেও জড়িয়ে পড়েছে আরসার সদস্যরা। সূত্র আরো জানায়, কক্সবাজার এলাকায় বাংলাদেশীদের অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশীদেরই নিয়োগ করছে মিয়ানমারের এই সন্ত্রাসীরা। আরসার নিয়োগ করা বাংলাদেশী স্থানীয় সদস্যরা ভিকটিমের পরিবারের সাথে দেনদরবার করছে। মুক্তিপণের বিষয়ে দফারফা হলেই ছাড়া পাচ্ছেন অপহৃতরা। ফিরে আসার পর মুক্তিপণের বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলছেন না।
গোয়েন্দারা বলছেন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে। মূলত নিজেদের আধিপত্য জানান দিতেই গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে তারা, যা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরসা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশেষ করে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটাচ্ছে। এর কারণ জানতে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজেদের কর্মতৎপরতা জানান দেয়ার পাশাপাশি অপহরণের সাথে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টিও জড়িত। এ জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বাইরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অপহরণ করে চলেছে আরসা সদস্যরা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন এনজিওর সাথেও আরসার যোগাযোগ রয়েছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরসার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হচ্ছে অপহরণ এবং অস্ত্র ব্যবসার। এসব বিষয়ে পুলিশ তাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সাথে আরসার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের প্ল্যান ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান সুসংহত করা। প্রশিক্ষণ দিয়ে আরসাকে স্ট্রং করা। মাদকসহ বিভিন্ন কারণে স্থানীয় লোকজনদের সাথেও এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠায় নিরাপত্তার বিষয়গুলো অনেকটাই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আরসার টপ লেভেলের নেতা আতাউল্লাহ এবং সামরিক শাখার প্রধান খালেদ মিয়ানমার থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। বিগত দিনগুলোতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের দেখা গেলেও এখন আর দেখা মেলে না। প্রতিটি ক্যাম্পে আরসার তৎপরতা রয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে তারা আলাদা আলাদা নেতা তৈরি করেছে। ক্যাম্পের ইনচার্জ ও বিভিন্ন পদে লোক রেখেছে তারা। আরসার সাথে জঙ্গি সংগঠনগুলোর যোগসাজশ পাওয়া গেছে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের মানসিক দুর্বলতাকে টার্গেট করে জঙ্গিরা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের জঙ্গিবাদে জড়ানোর শঙ্কা নেইÑ এ কথা বলা যাবে না।



