মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণের তোড়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ঢুকে পড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে থেকেই সেখানে ছিল আরো তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এদের আশ্রয় দিতে সব মিলিয়ে ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন করতে হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফে। এসব ক্যাম্পে এখন বাস করছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।
তার পর থেকে গত ছয় বছরে ক্রমাগত বিপর্যয় ঘটেছে উখিয়া-টেকনাফের পরিবেশ-প্রতিবেশের। সামাজিক ও অর্থনৈতিক জটিলতা ক্রমাগত বেড়েছে। বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনে সৃষ্টি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতা, তার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে অপরাধ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ আশপাশের এলাকায় দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। বেড়েছে সামাজিক নিরাপত্তার ঝুঁকি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ দৈনন্দিন জীবনযাপনে স্থানীয়দের ব্যয়ভার বেড়েছে অনেক। উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির প্রভাবশালী নেতা সাবেক উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা একটু বেশি। কোনো কাজকর্মে সম্পৃক্ত না থাকায় সেই প্রবণতা আরো বেড়েছে। এতে সামান্য বিষয় নিয়েও খুনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরির মিশনে কাজ করছে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় ডিসেম্বরের মধ্যে স্বেচ্ছায় ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ফেরত পাঠাতে একমত হয়েছে ঢাকা-নেইপিডো। সোমবার মিয়ানমারের রাজধানীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, বৈঠক শেষে মঙ্গলবার নেইপিডো থেকে ঢাকা ফিরবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনু বিভাগের মহাপরিচালক মিয়া মো: মাইনুল কবিরের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদল।
সূত্র জানায়, বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আস্থা তৈরির পদক্ষেপের বিষয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা কথা বলেন। পরিবারভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। পাইলট প্রকল্প হিসেবে তিন হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে মিয়ানমারকে। রোহিঙ্গারা যদি নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে বাংলাদেশ কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে রাখাইনে পাঠাবে না বলেও জানিয়েছে। তবে প্রত্যাবাসন শুরুর আগে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধিদল প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের সাথে আলোচনা করতে কক্সবাজার আসবে বলে জানা গেছে। এর আগে, চলতি বছরের ৫ মে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিদর্শনে বাংলাদেশে বসবাসরত ২০ রোহিঙ্গাসহ ২৭ জনের একটি প্রতিনিধিদল মিয়ানমারে যান। আরআরআরসি সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরুর পর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে প্রত্যাবাসনে আট লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছিল। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৬৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা চূড়ান্ত করে তা বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিল মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শুরু থেকেই সরকার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিদেশীয় উদ্যোগসহ আন্তর্জাতিক সব ফোরামেই ইস্যুটি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরছে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় চলছে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের পরীক্ষামূলক ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া। মিয়ানমারের সামরিক সরকার রাজি হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে থমকে ছিল পরীক্ষামূলক প্রত্যাবাসন।



