আসিয়ান সম্মেলন শুরু হতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আবারো ছলচাতুরি শুরু করেছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক চাপকে পাশ কাটাতেই ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার মৌখিক সম্মতি দিয়েছে দেশটি। সচেতন মহল এমন কূটকৌশলকে নতুন টালবাহানা বলছেন। দায়সারাভাবে তালিকা করায় প্রত্যাবাসন নিয়ে সন্দিহান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান। নতুন ও পুরনো মিলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর মধ্যে গেল ছয় বছরে ক্যাম্পে নতুন জন্ম নিয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার শিশু।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। এতে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর ও ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিন ঠিক হলেও তা ভেস্তে যায় মিয়ানমারের ছলচাতুরিতে।
এরপর দীর্ঘসময় থমকে যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। আর চলতি বছর চীনের মধ্যস্থতায় নতুন করে আলোচনায় আসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। দুই দফা কক্সবাজারের টেকনাফে আসে মিয়ানমার প্রতিনিধিদল। কিন্তু তাতেও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন।
এ দিকে গত মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় শুরু হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের ৪৩তম শীর্ষ সম্মেলন। এ সম্মেলনে সবসময় গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সঙ্কট।

এরই মধ্যে গত সোমবার নেইপিদোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মৌখিক সম্মতি জানায় মিয়ানমার। সচেতন মহলের দাবি, আসিয়ান সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক চাপকে পাশ কাটাতে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নতুন করে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার।

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় আসিয়ান সম্মেলন শুরু হচ্ছে। এতে দেশটির ওপর চাপ আসতে পারে, তাই নেইপিদোতে দুই দেশের বৈঠকে মৌখিকভাবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা আসার পর থেকে মিয়ানমার একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছে এবং তাদের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে; কিন্তু ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়া হয়নি। এটি মিয়ানমারের ছলচাতুরি কি না, আসলে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার নেবে কি না- এটি নিয়ে আমরা সন্দিহান।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী জানালেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিতে আগ্রহী; কিন্তু বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাঠাতে অক্ষম- এটি আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে মিয়ানমার।
তিনি বলেন, মৌখিক সম্মতি যদি হয়, তাহলে তা কখন, কোন তারিখে ফিরিয়ে নেয়া হবে, তা নির্ধারণ হলো না কেন? আর বাংলাদেশে তো এখন নির্বাচনের সময়। এ সময়টাতে কেন মিয়ানমার তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিতে নিতে মৌখিক সম্মতি জানাল, এটিকে মিয়ানমারের কূটকৌশল, পাঁয়তারা বা ভেল্কিবাজি মনে হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার কতটুকু আন্তরিক, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলে জানালেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে কয়েক দফায় আট লাখের বেশি পরিবারভিত্তিক রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ছয় বছরে মিয়ানমার এক লাখ এক হাজার রোহিঙ্গার তালিকা ভেরিফাই করে দিয়েছে। এটি মিয়ানমারের দৃষ্টিকোণ থেকে ভেরিফিকেশন, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এক লাখ এক হাজারের মধ্যে মাত্র ২০ হাজারকে পেয়েছি।

তিনি আরো বলেন, যারা প্রশ্নাতীতভাবে ভেরিফাইড এবং যেতে পারবেন এরকম মাত্র ২০ হাজার। বাকি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমার বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তারা প্রকৃতভাবে নিবন্ধিত নয়, তারা জঙ্গি গ্রুপের সদস্য- এসব বলে মিয়ানমার ভিন্ন তালিকাভুক্ত করেছে। সুতরাং আট লাখের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা আমরা দিয়েছিলাম, মিয়ানমারের তরফ থেকে গত ছয় বছরে খুবই ধীরগতিতে এবং খুবই দায়সারাভাবে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমরা শঙ্কিত, মিয়ানমার কতটুকু আন্তরিক এই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তা নিয়ে। তার পরও আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে মিয়ানমারের সাথে। আমরা আশা করব, প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার রাজি হবে। আমাদের প্রত্যাবাসন ছাড়া বিকল্প কোনো চিন্তা নেই।

হুমকি হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে।