বিদেশে কর্মরতদের ক্ষেত্রে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদনপত্রে স্বাক্ষর দেয়ার বৈধ পথ হচ্ছে অনলাইন কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ডাকে আবেদন করা। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে করা হলে আবেদনপত্রে বর্তমান নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের প্রতিস্বাক্ষর অপরিহার্য। তবে দুই পদ্ধতির কোনোটিই অনুসরণ না করে বিদেশে সমুদ্রগামী জাহাজে অবস্থান করে স্বহস্তে আবেদন ফরম পূরণ ও তাতে স্বাক্ষর করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নৌপরিবহন অধিদফতরের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে নৌপরিবহন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদের পক্ষে অন্য কেউ আবেদন ফরম পূরণ ও তাতে স্বাক্ষর করেন এবং জমা দেন। এরপর জাল স্বাক্ষরিত সেই আবেদনপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারিত দিনে সশরীরে হাজির হয়ে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিও পেয়ে যান। তবে প্রশ্নবিদ্ধ আবেদনে নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার পদে নিয়োগ পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলেও গিয়াসউদ্দিনকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শাস্তির বদলে পুরস্কারই পেয়ে চলেছেন তিনি। বর্তমানে একধাপ ওপরে চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ারের (সিএনএস) চলতি দায়িত্বে নিযুক্ত গিয়াসউদ্দিনের আগে নৌ-অধিদফতরের কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এক্সামিনার (সিএমই) এবং অধিদফতরের অঙ্গ সংস্থা নৌবাণিজ্য দফতরের মুখ্য কর্মকর্তা পদেও কয়েক বছর চলতি দায়িত্ব পালন করেছেন।
পিএসসির আবেদনপত্রে জাল স্বাক্ষর ছাড়াও গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠায় তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে দুদক। অনুসন্ধানকালে দুদকে জমা দেয়া গিয়াস ও তার গৃহিণী স্ত্রী সাজেদা আহমেদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদবিবরণীতে নৌ-অধিদফতরে যোগদানের আগে ২১টি জাহাজে চাকরি ও প্রাপ্ত বেতন-ভাতার ফিরিস্তি দেন। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি চাকরি করেছেন ১৬টি জাহাজে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নৌপরিবহন অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার পদে অস্থায়ী নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ২০১২ সালের ৮ মে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শর্ত অনুযায়ী, প্রার্থীকে স্বহস্তে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। ওই বছরের ৩১ মে ছিল আবেদনের শেষ দিন। ওই দিনই ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের আবেদন ফরম জমা হয়। এর সাথে জমা দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৩ মে’র সরকারি চালানেও তার স্বাক্ষর দেখা যায়। এরপর নির্ধারিত দিনে হাজির হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১২ সালের ৬ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তাকে অস্থায়ী নিয়োগ দেয়।
সমুদ্রগামী জাহাজের ক্যাডেট ও নন-ক্যাডেট- সব ধরনের নাবিকদের তথ্য সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শিপিং অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গিয়াসউদ্দিন ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ইউনিক্স লাইন প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি শিপিং লাইন্সের মালিকানাধীন এমটি আমাগি গ্যালাক্সি (কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার) জাহাজে ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি ইউনিক্স লাইন কিংবা আমাগি গ্যালাক্সি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদনপত্র জমা দেননি। জাহাজে অবস্থান করে তিনি কিভাবে আবেদন ফরম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চালানে স্বাক্ষর করেছেন, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া পিএসসির আবেদন ফরম এবং সরকারি চালান ফরমের স্বাক্ষরের সাথে গিয়াসউদ্দিনের পাসপোর্ট ও সিডিসির স্বাক্ষরেরও মিল নেই।
নৌ-অধিদফতর ও নৌ মন্ত্রণালয়সহ নৌখাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হলে গিয়াসউদ্দিনকে নিয়োগের চার বছর পর ২০১৬ সালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে নৌ মন্ত্রণালয়। এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটির প্রধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন এক যুগ্ম সচিবকে। তবে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন নৌ মন্ত্রণালয় কিংবা নৌ-অধিদফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গিয়াসউদ্দিনের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগটি যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় নৌবাণিজ্য দফতরের তৎকালীন একজন মুখ্য কর্মকর্তাকে। কিন্তু আবেদন ফরমের স্বাক্ষর আদৌ গিয়াসের ছিল কি-না, তা যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করেননি কর্মকর্তা। এমনকি অভিযুক্ত গিয়াসের পাসপোর্ট ও সিডিসির স্বাক্ষরের সাথে পিএসসির আবেদন ফরম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চালানের স্বাক্ষরের মিল ছিল কি-না, তাও যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কিংবা স্বীকৃত অন্য কোনো সংস্থার হস্তলেখা বিশেষজ্ঞর মতামত নেয়া হয়নি।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে দুদকে দাখিল করা গিয়াসউদ্দিনের সম্পদবিবরণীতে স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মূল্য দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৯৫ টাকা। এই টাকার মধ্যে ৯ কোটি ৬২ লাখ ৩০ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন স্ত্রী সাজেদা আহমেদের নামে। ২০১২ সালে নৌ-অধিদফতরে যোগদানের পর থেকে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ও এর আগে বিভিন্ন জাহাজ থেকে উপার্জিত অর্থ মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর এই সম্পদের হিসাব দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুদকে জমা দেয়া সম্পদ বিবরণীতে গিয়াসউদ্দিন ২১টি জাহাজে চাকরির কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলোর প্রথম পাঁচটি জাহাজের নাম ও কর্মকাল হলো- এমভি সমুদ্র রাজ (জুন, ১৯৯২-মার্চ, ১৯৯৪), এমভি সমুদ্র সম্র্রাট (জুলাই, ১৯৯৪-সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬), এমটি পেট্রো কনকর্ড (মে, ১৯৯৭-জুলাই, ১৯৯৮), এমটি পেট্রো রেঞ্জার (জুলাই, ১৯৯৮-জুন, ১৯৯৯) এবং এমটি পেট্রো স্ক্যাম (সেপ্টেম্বর ১৯৯৯-এপ্রিল, ২০০০)।
তবে নাবিকদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও জাহাজের নাম এবং কর্মকালীন তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সরকারি শিপিং অফিসের নথিতে ওপরের পাঁচটি জাহাজে গিয়াসউদ্দিনের চাকরির কোনো তথ্য নেই। সেখানে ১৬টি জাহাজের তথ্য রয়েছে। গিয়াসউদ্দিন দু’টি কোম্পানির মালিকানাধীন এই পাঁচটি জাহাজে চাকরির জাল কাগজপত্র তৈরি করে দুদকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া গিয়াসউদ্দিন মোট ২১টি জাহাজ থেকে প্রাপ্ত বেতনভাতার পরিমাণ যা দেখিয়েছেন, তা প্রকৃত আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এসব কারণে তিন বছরের বেশি সময় অনুসন্ধানের পরও দুদকের দায়মুক্তি পাননি তিনি। প্রথম অনুসন্ধান কর্মকর্তা কয়েক মাস আগে অবসরে যাওয়ায় গিয়াসের বিরুদ্ধে নতুন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে দুদক।
এ ব্যাপারে ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি ১২ বছর আগে চাকরিতে যোগদান করেছি। আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয়, ডিজি শিপিংসহ তিনটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটির প্রত্যেকেই আমার পক্ষে রিপোর্ট দিয়েছে। ১২ বছর আগের ঘটনা নিয়ে এখন কারা অভিযোগ দিয়েছে, এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা অবৈধ সম্পদের বিষয় দুদক যে অনুসন্ধান করছে, সে বিষয় তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
স্বাক্ষর জালিয়াতি করে চাকরি নেয়ার বিষয়টি অপরাধ কিনা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হারুনুর রশীদ বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যম ছাড়া বিদেশে অবস্থানকালে দেশের কোনো আবেদনপত্র কিংবা দাফতরিক কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা আইনসিদ্ধ নয়। আইনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।