কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছাড়াও আশপাশের এলাকায় অপহরণে জড়িয়ে পড়েছে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান নিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে মিশে গিয়ে আরসা সদস্যরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের শক্তি বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু অপহরণ নয়, অস্ত্র ব্যবসার সাথেও জড়িয়ে পড়েছে আরসার সদস্যরা। সূত্র আরো জানায়, কক্সসবাজার এলাকায় বাংলাদেশীদের অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশীদেরই নিয়োগ করছে, মিয়ানমারের এই সন্ত্রাসীরা। আরসার নিয়োগ করা বাংলাদেশী সদস্যরা ভিকটিমের পরিবারের সাথে দেন-দরবার করছে। মুক্তিপণের বিষষয়ে দফারফা হলেই ছাড়া পাচ্ছেন অপহ্নতরা। ফিরে আসার পর মুক্তিপণের বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলছেন না। গোয়েন্দারা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে মূলত নিজেদের আধিপত্য জানান দিতেই গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে তারা। যা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরসা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশেষ করে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটাচ্ছে।
এর কারণ জানতে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজেদের কর্মতৎপরতা জানান দেয়ার পাশাপাশি অপহরণের সাথে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টিও জড়িত। এ জন্য ক্যাম্প ও বাইরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অপহরণ করে চলেছে আরসা সসদস্যরা। এর মধ্যে টেকনাফে গত ৯ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উপজেলা থেকে ৯২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের ৪২ জন রোহিঙ্গা এবং ৫০ জন স্থানীয় বাসিন্দা।
সর্বশেষ গত রোববার টেকনাফের বাহারছড়া পাহাড়ি এলাকা থেকে মাহমুদুল হক (২৮) নামের এক যুবক অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। এর আগে গত শনিবার সকালে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবনিয়া পাহাড় থেকে ওই যুবককে অপহরণ করা হয়। মাহমুদুল হক উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবনিয়া গ্রামের আলী আহমদের ছেলে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেন টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ। তিনি বলেন, পুলিশ অপহৃত যুবককে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি অপহরণকারীরা মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে কক্সবাজারের তিন বন কর্মীকে পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যায়। অপহরণের প্রায় ৭৯ ঘণ্টা পর উদ্ধারের আগে ওই তিনজনকে পুরো সময় থাকতে হয়েছে অনাহারে। মুক্তিপণ আদায় করতে তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। উদ্ধারকর্মীদের দেখতে পেয়েও মাথায় অস্ত্র ঠেকানোর কারণে ডাক দিতে পারেননি তারা। গত ৪ সেপ্টেম্বর টেকনাফ থানা পুলিশের প্রেস ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অপহরণকারী দলের এক সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার ফয়সালের (৩০) বাড়ি মহেশখালীর কালারমারছড়ায়। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় তৈরি একনলা দু’টি লম্বা বন্দুক ও ৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ জব্দ করা হয়। ভুক্তভোগীদের একজন আবদুর রহমান (৩৭)। তিনি টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার মৃত বকসু মিয়ার ছেলে। অশ্রুসজল কণ্ঠে সেদিন ব্রিফিংয়ে উপস্থিত হয়ে শোনালেন নির্মমতার গল্প। বলেন, আমাদের ঠিকমতো খেতেও দেয়নি। নির্যাতনের মাত্রাও কমায়নি। অমানুষিক নির্যাতন সইতে হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা আমাদের খোঁজে পাহাড়ে গেলে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু অপহরণকারীরা তখন আমাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে রাখায় ডাক দিতে পারিনি। ওই সময় পুলিশ ও স্থানীয়রা পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে রেখে অভিযান চালালে অপহরণকারী সন্ত্রাসীরা আমাদের রেখে পালিয়ে যায়। অপহরণ কিভাবে হয়েছেন তা-ও বর্ণনা করেন ওই বনকর্মী। বলেন, বন পাহারাদলের সদস্য হিসেবে রুটিন মতো আমরা দমদমিয়া পাহাড়ে দায়িত্ব পালন করছিলাম। হঠাৎ একদল অস্ত্রধারী এসে আমাদের তিনজনকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যায়। আটকের পর মুক্তিপণ পেতে নির্যাতন শুরু করে। বাড়িতে কল করে প্রত্যেকের জন্য ২০ লাখ টাকা করে দাবি করে আসছিল তারা।
এ ঘটনায় অপহ্নত অপর দু’জন হলেন- টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে মোহাম্মদ শাকের (২৪) ও মৃত আবদুল শুক্কুরের ছেলে আবদুর রহিম (৩২)। উখিয়া-টেকনাফ (সার্কেল) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল ব্রিফিংকালে বলেন, তিন বনকর্মী দমদমিয়া নেচার পার্ক-সংলগ্ন পাহাড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হঠাৎ ১০-১৫ জনের একটি ডাকাত দল তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যায়। অপহরণের পর থেকে আমরা একাধিকবার পাহাড়ে ভেতর অভিযান চালাই। গত ৪ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টার দিকে গহিন পাহাড়ে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে আমরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছাই তখন ডাকাত দল পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় পুলিশও আত্মরার্থে পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে ডাকাত দল অপহ্নতদের রেখে পালিয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, গত ৯ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ টেকনাফ থেকে ৯২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন রোহিঙ্গা ও ৫০ জন স্থানীয় বাসিন্দা। সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল নয়াপাড়া ক্যাম্পের তিন শিশু অপহরণের শিকার হন। পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।



