দ্য মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড (এমসিসিএইচএসএল)। লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়, অথচ এই সোসাইটিকে ঘিরে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। দুর্নীতি আর অনিয়মই যেখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। পরিচালনা কমিটির সবাই অবৈতনিক। অথচ সমবায় আইন লঙ্ঘন করে কমিটির এক একটি পদ বছরের পর বছর দখল করে রাখা হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির অবৈতনিক চেয়ারম্যান পদে বর্তমানে যিনি রয়েছেন, তিনি প্রায় ১১ বছর ধরে আছেন। অভিযোগ উঠেছে সোসাইটিকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি আর লুটপাট হচ্ছে। পরিচালনা কমিটির অনেকেই গড়েছেন কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ।
সম্প্রতি সোসাইটির চেয়ারম্যান আগষ্টিন পিউরিফিকেশনসহ পরিচালনা কমিটির কয়েকজনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেছেন সোসাইটির সদস্য অমূল্য লরেন্স পেরেরা। অন্য দিকে মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিচেডের চতুর্থ মেয়াদে সেক্রেটারির পদে থাকা ইমানুয়েল বাপ্পি মণ্ডল, চতুর্থ মেয়াদে ট্রেজারার পদে থাকা বাদল বি. সিমস্যাং, চতুর্থ মেয়াদে পরিচালক পদে থাকা কল্পনা ফলিয়া, পরিচালক ডেভিড প্রবিন রোজারিও এবং সিনিয়র ম্যানেজার (ল্যান্ড) রতন আর পেরেরার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়েছে। তারা সমবায় প্রতিষ্ঠানটি লুটপাট করে অঢেল অর্থ বিত্তের মালিক বনে গেছেন বলে দুদকে দাখিল করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগষ্টিন পিউরিফিকেশন সোসাইটিতে বর্তমানে অবৈধভাবে চেয়ারম্যান পদে আছেন। সমবায় আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০১৩) এর ১৮(৮) ধারায় বলা হয়েছে ‘ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে একাধিক্রমে তিনটি মেয়াদ পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো সদস্য উক্ত মেয়াদের অব্যবহিত পরবর্তী একটি মেয়াদের নির্বাচনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন না।’ অথচ সমবায়ের আগষ্টিন পিউরিফিকেশন দ্য মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডে অবৈধভাবে চতুর্থ মেয়াদে চেয়ারম্যানের পদ দখল করে আছেন। এ বিষয়ে সমবায় অধিদফতরের ২০২০-২১ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত দেখানো চেয়ারম্যানসহ চারজনকে অপসারণের নির্দেশনা দেয়া হয় এবং তাদের স্বাক্ষরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বন্ধ করতে বলা হয়। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে আগষ্টিন পিউরিফিকেশন চেয়ারম্যানের পদ দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ।
সমবায় অধিদফতরের উপনিবন্ধক ও অডিট দল প্রধান মোছা: নূর-ই-জান্নাত এর নেতৃত্বে সম্পাদিত অডিট রিপোর্টে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে- বর্তমান কমিটির পূর্বের কমিটির মেয়াদ ২৯/১০/২০২১ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। করোনা মহামারির অজুহাত দেখিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সমবায় সমিতি আইন ২০০১ (২০০২,২০১৩) এর ৪ ধারা থেকে অব্যাহতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে (আদেশ নং-৪৭.৬১.০০০০.০৩২.০৬.০৮৬.১৬-৩৬৮ তারিখ ১৪/৯/২০২১) ৪ ধারা থেকে অব্যাহতি পেয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ ১২০ দিন বৃদ্ধি পায়। সে মোতাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ ২৮/২/২০২২ তারিখ পর্যন্ত বহাল থাকে।
পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ১৯/২/২০২২ তারিখের নির্বাচনে চেয়ারম্যান আগষ্টিন পিউরিফিকেশন, সেক্রেটারি ইমানুয়েল বাপ্পি মণ্ডল, পরিচালক অর্থ ও প্রশাসন বাদল বি সিমস্যাং ও সদস্য কল্পনা মারিয়া ফলিয়া চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। উক্ত চার ব্যক্তি সমবায় সমিতি আইন ২০০১(২০০২,২০১৩)এর ১৮(৮) ধারা এবং জারিকৃত সংশ্লিষ্ট তফসিলের নির্বাচনী জ্ঞাতব্য বিষয়ের ৬নং শর্ত অনুযায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য অযোগ্য। দ্রুত তাদের ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে অপসারণ করার লক্ষ্যে সমবায় সমিতি আইন ২০০১(২০০২,২০১৩)-এর ধারা ২২(১) অথবা সমবায় সমিতি বিধিমালা ২০০৪ এর ৩৮ ও ৩৯ বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরে উক্ত চারটি শূন্য পদে সমবায় সমিতি আইন ২০০১(২০০২,২০১৩)এর ধারা ২০(১) অনুসরণ করে যোগ্য সদস্যকে কো-অপ্ট করা যেতে পারে। অথচ রহস্যজনক কারণে এখনো আগষ্টিন পিউরিফিকেশনসহ অন্যান্য চারজনকে অপসারণ করা হয়নি। অডিট রিপোর্টের সুপারিশ, আইন উপেক্ষা করে চেয়ারম্যানের পদ দখল করে আছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই কাজে সহযোগিতা করেছেন সমবায় অধিদফতরের কিছু অসৎ কর্মকর্তা।
চতুর্থ মেয়াদে অবৈধভাবে আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন অমূল্য লরেন্স পেরেরা। রিট পিটিশন নং-৫৫৯১/২০২৩। হাইকোর্ট এই আইন বহির্ভূত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমবায় অধিদফতরের নিবন্ধকের প্রতি আদেশ প্রদান করেন।
সূত্র মতে, আগষ্টিন পিউরিফিকেশন ৮-১২-২০০৬ থেকে ৮/১২/২০০৯ পর্যন্ত সমিতির বোর্ড ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। ৬-১২-২০১২ তারিখ থেকে একটানা চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। কেবল প্রথমবার নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। পরে সমবায় অধিদফতরের কিছু অসৎ কর্মকর্তার সহায়তায় কৌশল করে ভুয়া নির্বাচন দেখিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জেল জুলুমের ভয় দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, আগষ্টিন দ্য মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড ও দ্য কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিগ অব বাংলাদেশ লিমিটেড (কালব) এ অবৈধভাবে চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। সমিতিকে বানিয়েছেন নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এমসিসিএইচএসএল-এ নেই কোনো জবাবদিহিতা। বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একা সব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। সমবায় অধিদফতরের ২০২০-২১ অর্থবছরের অডিটেও অনেক অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। মামলার পেছনে অতিরিক্ত ব্যয়, বিলের ভাউচার যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা, অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকে লেনদেন না করে নগদ অর্থ প্রদান, অতিরিক্ত নগদ অর্থ হাতে জমা রাখা, সরাসরি জমি না কিনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বেশি দামে জমি কেনা, উন্নয়ন কাজে দরপত্র ছাড়া ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম, বারবার বাজার দরের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে জমির ঊর্ধ্ব মূল্যায়নসহ নানা অনিয়মের সমালোচনা করা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।
অন্য দিকে অবৈধভাবে চেয়ারম্যানের পদ দখলে রাখা, অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করার জন্য সমবায় মন্ত্রণালয়, সমবায় অধিদফতর ও দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেছেন অমূল্য লরেন্স পেরেরা ও রিচার্ড জেভিয়ার কল্লোল প্যারিশ। মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লি: এর সদস্য অমূল্য লরেন্স পেরেরা ও রিচার্ড জেভিয়ার কল্লোল প্যারিশ এর আবেদনের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে সমবায় মন্ত্রণালয় আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের দুর্নীতি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে সমবায় অধিদফতরকে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উপসচিব সিদ্ধার্থ শংকর কুন্ডু স্বাক্ষরিত এক পত্রে (স্মারক নং-৪৭.০০.০০০০.০৩২.০৬.০৬২.১৫.১৩৯ তারিখ-৩০/৩/২০২৩) এই আদেশ প্রদান করেন। অবশ্য আগেই সমবায় অধিদফতর ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধককে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। সমবায় অধিদফতরের উপনিবন্ধক মাফরোজা আক্তার স্বাক্ষরিত এক পত্রে (স্মারক নং- ৪৭.৬১.০০০০.০২৪.৪০.০৭০.১৮.৭৭ তারিখ-১/৩/২০২৩) এই আদেশ প্রদান করেন। তাদের আবেদনেরপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সোসাইটির চেয়ারম্যান আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেন, কিন্তু কোনো কথা না বলে লাইন কেটে দেন। পরে তাকে হোয়াটসআপে মেসেজ দেয়া হলেও কোন সাড়া দেননি। সেক্রেটারি ইমানুয়েল বাপ্পী মণ্ডলের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনিও রিসিভ করেননি।



