ফিলিস্তিনের গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরাইল ব্যাপক আর্থিক, বাণিজ্যিক ক্ষতি এবং খাদ্যসঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ সমুদ্রপথে ইসরাইলমুখী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া। ইয়েমেন লোহিত সাগরে ইসরাইলের বা ইসরাইলমুখী জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়ার পর বহু জাহাজ কোম্পানি ইসরাইলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে লোহিত সাগর দিয়ে ইসরাইলে কোনো মালামাল বা জিনিসপত্র আসা ও যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য দিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা দিয়েছেন, মালয়েশিয়ার সমুদ্রপথ দিয়ে ইসরাইলি জাহাজ প্রবেশ করতে দিবেন না। ফলে ইসরাইল এখন খাদ্য ও পেট্রল সঙ্কটসহ বহির্বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্কটে পড়েছে।
ফিলিস্তিনের গাজায় এবং কিছুটা কম হলেও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের গণহত্যা তীব্রভাবে অব্যাহত রয়েছে। মুসলিমদের এই গণহত্যায় মিত্রশক্তি হিসেবে সাথে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শুধু মারাত্মক অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য নয়, অনেকে বলছেন, মার্কিন সেনারাও বিশেষ করে নৌবাহিনীর কমান্ডোরা ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। হামাস নিধনের নামে তাদের লক্ষ্য, পশ্চিম এশিয়ায় ইসরাইলের আধিপত্য বজায় রাখা এবং তার জন্য গাজার কয়েক লাখ মানুষকে সরাসরি কিংবা খাদ্য, পানীয়, ওষুধ এবং আশ্রয়ের অভাবে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া।
শুক্রবার জুমার দিনও ইসরাইল গাজায় তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে। তারা গাজার পুরনো শরণার্থী ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় কার্পেট বোম্বিং করে চলেছে। অবরুদ্ধ গাজায় কোনো ত্রাণসামগ্রী ইসরাইল প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। ফলে গাজায় প্রায় ছয় লাখ নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ অনাহারে মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এসব নিয়ে শান্তি ও মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সহযোগী দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানির কোনো বক্তব্য নেই।
গাজায় এখন পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে শিশু ও নারীদের সংখ্যাই বেশি। আর আহতের সংখ্যা প্রায় ৫৩ হাজার। আহতদের বেশির ভাগই গুরুতরভাবে জখম হয়েছে। বেঁচে থাকলে অনেকেই সারা জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসার কোনো সুবিধাই এই মানুষগুলোর হাতে পৌঁছাচ্ছে না। ইসরাইলি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণে গাজার সব হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে গেছে। আর যে দুই-একটি এখনো টিকে আছে তাতে জরুরি ওষুধ ও অন্য সরঞ্জাম নেই।
নিরাপত্তা পরিষদে আবার বৈঠক হয়েছে। সেখানে মার্কিন চাপে একটা দায়সারা প্রস্তাব পাস হয়েছে। বলা হয়েছে, গাজায় মানবিক ত্রাণসাহায্য পাঠানো উচিত। যুদ্ধ বন্ধের কোনো কথা এই প্রস্তাবে নেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদ শেষ পর্যন্ত যে প্রস্তাব পাশ করেছে তা অর্থহীন। এর বাস্তবায়ন কিভাবে হবে, আদৌ হবে কি না সে সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
অর্থাৎ যুদ্ধ, বোমা বর্ষণ, নরসংহার ও ধ্বংস প্রক্রিয়া জারি থাকবে। শুধু গাজায় খাবার, ওষুধ পাঠানো হবে। কিন্তু যুদ্ধ না থামলে কারা এগুলো ব্যবহার করবে, কী করে ব্যবহার করবে তার কোনো সিদ্ধান্ত তারা দিতে পারছে না।
গাজা যুদ্ধের একটি অন্য দিকও রয়েছে। ইসরাইল কিন্তু ব্যাপক আর্থিক, বাণিজ্যিক ক্ষতি ও খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে। সবার একটা প্রশ্ন, কতজন ইসরাইলি সৈন্য নিহত হয়েছে। এখন প্রতিদিনই ৪০-৫০ জন করে ইসরাইলি সৈন্যের মুখোমুখি যুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর আসছে।
এ ছাড়া হামাসের আল কাসেম ব্রিগেড জানিয়েছে, তারা প্রায় ৭০০-এর বেশি ইসরাইলি সাঁজোয়া গাড়ি এবং ১৫০-এরও বেশি ইসরাইলি ট্যাংব ধ্বংস করেছে। এর ছবিও আল কাসেম ব্রিগেড প্রকাশ করেছে। একটি সাঁজোয়া গাড়িতে কম করে ১০-১২ জন সেনা থাকে। আর ট্যাংকে থাকে ছয়-সাতজন সেনা।
হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলি সেনার মৃত্যু কম হলেও সাত হাজারের বেশি। আহতের সংখ্যাও অনেক। যারা ইসরাইলি কবরস্থান ও হাসপাতালের খবর রাখছেন তারা বলছেন, আহত ও নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, এখনো ইসরাইল ছোট্ট একটি সংগঠন হামাসকে পরাজিত করতে পারেনি। এখনো হামাস রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যাচ্ছে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে। আর গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, ইসরাইলের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে।
ইসরাইলের মালামাল আদান-প্রদানে একমাত্র রাস্তা হচ্ছে সমুদ্রপথ। দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন লোহিত সাগরে ইসরাইলের বা ইসরাইলমুখী জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়ার পর বহু জাহাজ কোম্পানি ইসরাইলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে লোহিত সাগর দিয়ে ইসরাইলে কোনো মালামাল বা জিনিসপত্র আসা ও যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই পথ খোলার জন্য বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীকে সাথে নিয়ে একটি জোট গড়তে চাইছে। কিন্তু ওই মিত্র দেশগুলোর অনেকে বলে দিয়েছে তারা এই জোটে অংশ নেবে না। আরব দেশগুলো ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে এই জোটে অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। ইসরাইলের আরেকটি সমুদ্রপথ ছিল মালয়েশিয়া হয়ে মালাক্কা প্রণালী। কিন্তু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, আমরা মালয়েশিয়ার সমুদ্রপথ দিয়ে ইসরাইলি জাহাজের আনাগোনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলাম। ফলে ইসরাইল এখন খাদ্য ও পেট্রল সঙ্কট, বহির্বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্কটে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর নানা ধরনের হুঙ্কার সত্ত্বেও ইসরাইল এখন গাজার যুদ্ধে গভীর সমস্যা ও সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ ইহুদিরা যুদ্ধবিরতি চাইছে। ইসরাইলের এখন একমাত্র ভরসা যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ গাজার ওপর এই নির্মমতা ও বর্বরতা বন্ধ করার জন্য বিক্ষোভ শুরু করেছে। তাই গাজা যুদ্ধ ইসরাইলের পতন ডেকে আনছে কিনা তা আগামীতে দেখার বিষয়।



