২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। উখিয়া কুতুপালংয়ে আগে থেকেই ছিল অনেক রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে হিন্দু ও মুসলিম রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ লাখে। এই বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দুষ্টু লোকদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে তারা। ফলে কালোবাজারিরা মাদক, মানব পাচারকারীরা পাচারে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী খুনোখুনিতে ও অসৎ রাজনীতিকরা তাদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে তাদের। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রোহিঙ্গা তরুণদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাসী হিসেবে গড়ে তুলছে। ফলে সঙ্ঘাতের খেলায় মেতেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসসীরা।

ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, প্রতিনিয়তই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন, রক্তপাত ও অরাজকতা বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে জোরদার করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ টহলের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে চেকপোস্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি। ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এপিবিএন পুলিশ। আরসা, আরএসও’র মতো একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সক্রিয় তা নয়। এরা মিয়ানমারেও সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। পাকিস্তানে জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী আরসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যাম্পে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়। এসব পাহাড়েই অবস্থান নেয় আরসা, আরএসওসহ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে তারা এই ক্যাম্প থেকে ওই ক্যাম্পে এমনকি মিয়ানমারেও পালিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে। ক্যাম্পের ভেতরেই তাদের শক্ত অবস্থানের ফলে সাধারণ রোহিঙ্গারা ভয়ে মুখ খুলতে চান না। র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন, আনসার ও বিজিবির যৌথ বাহিনীকে সহযোগিতা করেন ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করায় ক্যাম্প কমিউনিটি নেতা বা রোহিঙ্গা মাঝিদের টার্গেট করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো তাদের গুলি করে পাখির মতো হত্যা করে।

সাধারণ রোহিঙ্গাদের দাবি, স্বদেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পে নিরাপদে থাকতে চান তারা। জামতলী ক্যাম্পের ডি ব্লকের বাসিন্দা নুরুল হাকিম বলেন, ক্যাম্পে যে খুনোখুনি, গোলাগুলি ও সংঘর্ষ চলে-এগুলো আমরা চাই না। ক্যাম্পে এসব অস্থিরতা বন্ধ হোক। যতদিন নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে না যাচ্ছি, ততদিন যেন ক্যাম্পে শান্তিতে বসবাস করতে পারি। এই নিরাপত্তা দাবি করছি আমরা। আরেক রোহিঙ্গা জিয়াবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পকে নিরাপদ করতে প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করুক, এটা আমাদের দাবি। এখন প্রশাসনের টহল ও অভিযান বেড়েছে। এতে অনেক অপরাধী পালিয়েছে। আমরা চাই ক্যাম্পে একটু শান্তিতে বসবাস করতে।

উখিয়া সদনের রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই অস্থিরতা রোধে এবং দুষ্কৃতকারীদের আইনের আওতায় এনে ক্যাম্পে ও স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পে ঘটা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মিয়ানমারের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। মিয়ানমার থেকে মরণ নেশা ইয়াবা, আইস আনাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, যৌথ অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হল মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ঠেকানো। যেসব তথ্য পাচ্ছি সেসব তথ্যের ভিত্তিতে আমরা সব বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে আরসাসহ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো থেকে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মুক্তি ও স্বস্তি দিতে কাজ করে যাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি এপিবিএনসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।