বিদায় নিতে যাওয়া ২০২৩ সালে দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরার মতো বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো চিত্রও চোখে পড়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে মামলা কমলেও দায়মুক্তি বা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেয়া বেড়েছে। সাফল্য বলতে ছিল মামলার দীর্ঘ আট বছর পর বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

চলতি বছরের ৯ মাসে (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৩০৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ওই সময়ে মাত্র ১৯৬টি মামলা হয়। কিন্তু ৯ মাসেই পরিসমাপ্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৫৯টি অভিযোগ, যা ২০২২ ও ২০২১ সালের ১১ মাসের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে চার্জশিট কিছুটা বেশি, ২৪৭টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫টি মামলার চার্জশিট না দিয়ে এফআরটির (মামলা থেকে অব্যাহতি) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
২০২২ ও ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৩১২টি ও ২৪৪টি অভিযোগ পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ওই সব অভিযোগে দুর্নীতি খুঁজে পায়নি দুদক অনুসন্ধান বিভাগ।

দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দুদকের বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫৪টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়। ওই মামলা দায়ের হয় ২৭৬টি। ওই সময়ে ৩১২টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। ওই সময়ে ১৬২টি মামলার চার্জশিট দিয়েছিল দুদক। আর ৭৮টি মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩২৬টি দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। একই সময়ে ৩১১টি দুর্নীতির মামলা হয়। ওই সময়ে ২৪৪টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। তদন্ত শেষে ২২২টি মামলার চার্জশিট দায়ের হয়। ওই সময়ে এফআরটি (মামলা থেকে অব্যাহতি) হয়েছিল ৮০টি মামলার।

মানিলন্ডারিং ক্ষমতা ফেরাতে নেই গতি : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অর্থপাচারের পরিমাণ বাড়ছে। ২০০৯-২০১৫ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে চার লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বা চার হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার। এ হিসাবে গড়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। বছরজুড়েই মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অভিযোগের তীর ছিল দুদকের দিকে। এমনকি দেশের উচ্চ আদালত থেকেও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে দুদক ঘুমিয়ে আছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। যে কারণে মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত সব অপরাধের তদন্ত ক্ষমতা আবার ফিরে পেতে আইন ও বিধি সংশোধনের তোড়জোড় বাড়িয়েছে দুদক। যত দ্রুত সম্ভব মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় দুদকের তফসিলভুক্ত যেকোনো অপরাধ অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন চেয়েছে সংস্থাটি। কারণ হিসেবে দুদকের দাবি ছিল বিদ্যমান মানিলন্ডারিং আইনে আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে না। এর বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হয় তারও তদন্তের ক্ষমতা দুদকের এখতিয়ারের বাইরে। যে কারণে ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অর্থপাচারসহ সম্পৃক্ত সব অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত অন্যান্য পাঁচটি সংস্থার পাশাপাশি দুদককেও প্রদানের লক্ষ্যে আইন ও বিধিমালা (তফসিলসহ) সংশোধনে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সংস্থাটি।

মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত সব অপরাধ তদন্তে আগের ক্ষমতা ফিরে পেতে আইন ও বিধি সংশোধনের তোড়জোড় ছিল ২০২২ সাল থেকেই। ওই বছর মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধে জাতীয় সমন্বয় কমিটির ২৬তম সভায় দুদক চেয়ারম্যান দাবির পক্ষে সমর্থনও করে জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে (বিএফআইডি) প্রস্তাবনা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেন। এরপর ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর বিএফআইডি, দুদক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের আরো একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওখানে বিধিমালা (তফসিলসহ) সংশোধনের জন্য দুদকের কাছে প্রস্তাবনা চায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৯ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কিন্তু ২০২৩ সাল শেষ হলেও বিধিমালা সংশোধন আলোর মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে দুদক সচিব মো: মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত ২৭টি অপরাধের মধ্যে কেবলমাত্র ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত মানিলন্ডারিং অপরাধ দুদকের আওতায়। ফলে আমাদের অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব হলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আমরাও যেন বাকি ২৬টি অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার যেন দুদক পায়। এ বিষয়ে আমাদের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

মামলার ৮ বছর পর আসামি বেসিক ব্যাংকের বাচ্চু : নানা সমালোচনা ও প্রশ্ন পেরিয়ে মামলার দীর্ঘ আট বছর পর চলতি বছরে জুনে আলোচিত সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে বেসিক ব্যাংকের ৫৮ মামলার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে দুদক। চার্জশিটে বাচ্চুসহ ১৪৭ জনকে আসামি করা হয়। ৫৮টি মামলার তদন্তে নতুন আসামি হিসেবে আলোচিত আবদুল হাই বাচ্চু ও কোম্পানি সচিব শাহ আলম ভূঁইয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ ২০১৫ সালে দায়ের করা কোনো মামলায়ই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। যে কারণে দুদককে বারবার নানা প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে। চার্জশিটে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট দুই হাজার ২৬৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। আসামিদের মধ্যে ৪৬ জন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ১০১ জন গ্রাহকসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা রয়েছে। যেখানে ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে ৪৮টি মামলায়। আর ডিএমডি ফজলুস সোবহান ৪৭টি, কনক কুমার পুরকায়স্থ ২৩টি, মো: সেলিম আটটি, বরখাস্ত হওয়া ডিএমডি এ মোনায়েম খানকে ৩৫টিতে আসামি করা হয়।

২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠার পরপরই অনুসন্ধানে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া, জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণদানসহ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে। প্রায় পাঁচ বছর অনুসন্ধান শেষে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনে টানা ৫৬টি মামলা হয়।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় যখন মামলা করা হয় তখন দুদক চেয়ারম্যান ছিলেন মো: বদিউজ্জামান। তিনি মামলার তদন্ত শেষ করে যেতে পারেননি। তারপর ২০১৬ সালের দুদক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ইকবাল মাহমুদ। তার পাঁচ বছরেও বেসিক ব্যাংকের তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। আর সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ২০২১ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। তার আমলে মামলার তদন্ত শেষ করা হয়। এ মামলার তদন্ত করে চার্জশিট দিতে দুদকের ৮ বছর লেগে যায়।
দুদকের আসামি নোবেল বিজয়ী ইউনূস : গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে চলতি বছরের ৩০ মে দুদক। এই বছরের গত ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। যদিও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আত্মসাতের মামলা মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছে অভিযোগ ইউনূসের পক্ষ থেকে।