বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের ছিল গভীর রাজনৈতিক ব্যবসায়িক ও বৈবাহিক সম্পর্ক। তাই তো মনের টানে মানবিক হয়ে সব সময় রোহিঙ্গাদের পাশে রেখেছেন কক্সবাজার তথা চট্টগ্রামাঞ্চলের মানুষ। দীর্ঘ দিন ধরে মিয়ানমারের আকিয়াব শহরে ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত আছেন কক্সবাজারের অনেক লোকজন। সে সুবাদে অনেকের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কও রয়েছে। রাজনৈতিক সম্পর্কও ছিল। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে সহাবস্থান অত্যন্ত মজবুত। উখিয়া-টেকনাফের মানুষ মিয়ানমারের বলিবাজার, আকিয়াব ও মংডুতে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। দুই দেশের জনগণের সাথে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এক সময় মিয়ানমারের সংসদ সদস্য হিসেবেও মুসলিম রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ ছিল। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জায়গা জমি ছিল। নবতিপর বৃদ্ধ মোহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন বলেন, মিয়ানমারে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য বাবার মৃত্যুর পরে আমি দেখাশুনা করতাম। আমরা সেখানেই বড় হয়েছি। আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু মিয়ানমার আমাদের জন্য এখনো নিরাপদ না। এখানে আমরা নিরাপদে আছি। এখানকার মানুষ আমাদের ভালোবাসে। মিয়ানমারে আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে যেতে পারলে নিরাপদে থাকব। তবে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আমাদের জন্য বিপজ্জনক। ১৯৬২ সালে মিয়ানমারের ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে চলে আসার পর থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্টীয় বৈষম্য ও নির্যাতন বৃদ্ধি পেতে থাকে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হামলা-নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বহু দশকের দমন-পীড়নের এই ধারা চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। বর্তমানে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার ছৈয়দুল্লাহ বলেন, মিয়ানমারে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। শিক্ষা, চাকরি সব ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার। রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন পর্যন্ত করত না মিয়ানমার সরকার। ১৯৭৪ সালে সামরিক সরকার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নাগরিকত্ব কার্ড বহন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন রোহিঙ্গাদের কোনো নাগরিকত্ব কার্ড ছিল না। প্রথম দিকে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও ১৯৭৭ সালে সামরিক সরকার শুরু করে অপারেশন নাগামিন। মূলত অবৈধ অভিবাসন শনাক্ত করার জন্যই এই অপারেশন চালু করা হয়। যার সূত্র ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ফের অমানবিক নির্যাতন চালায়। ফলে তাদের নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ থাকে না। মিয়ানমারে টিকে থাকা আমাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ১৯৭৮ সালের মে মাসে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৮২ সালে ৫ অক্টোবর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার নতুন নাগরিকত্ব আইন জারি করে। এই নতুন আইনের দ্বারা সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের গোত্র হিসেবে অস্বীকার করার পাশাপাশি তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের অধিকার অস্বীকার করে এবং প্রকাশ্যে তারা বিরুপ মনোভাব দেখাতে শুরু করে। শুরু হয় রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত জীবন। থাইংখালী ময়নাঘোনা ক্যাম্পের বাসিন্দা সেতারা বেগম ও মায়েশা বলেন, মিয়ানমারে মংডু শহরের ফিয়াজিপাড়া গ্রামে আমাদের বসবাস ছিল। সেখানে নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর অনুমতি নিয়ে যেতে হতো। আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রামে ফিরে না এলে গ্রামের বাসিন্দা থেকে তাদের নাম কেটে দেয়া হতো। সেই সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করত নাসাকা বাহিনী। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়া যেত না।