ময়মনসিংহের ভালুকায় এসকিউ গ্রুপের কারখানায় ৩৪ শ্রমিক গণমনস্তাত্ত্বিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল জেলা সিভিল সার্জনের গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির তদন্তে এটি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) হাসানুল হোসাইন। তা ছাড়া জেলা প্রশাসক ও শিল্পপুলিশের পক্ষ থেকে আরো দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন হয়।
সিভিল সার্জন গঠিত তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার এসকিউ গ্রুপের বিরিকিনা ইউনিট ২ এ কর্মরত রিফাত হাসান (৩০) ও বুধবার নারগিস আক্তার (৪৫) নামের দুই শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। শনিবার এই বিষয়টি কারখানায় ছড়িয়ে পড়লে গণমনস্তাত্তিক রোগে আক্রান্ত হন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। তখন কারখানার অন্য লোকজন খোঁজ পেয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে ৩২ জন শ্রমিককে শ্রীপুরের মাওনা আল হেরা হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন আল হেরায় ভর্তি হওয়া রোগীরা। অপর দিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছয়জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
গতকাল সরেজমিন কারখানার একাধিক শ্রমিকের সাথে কথা বলে যানা যায়, ওই দিন কারখানায় হঠাৎ করে বেশ কয়েকজনকে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যেতে দেখেছেন। তাদেরকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে অনেকেই বাড়ি ফিরেছেন। কী কারণে এমনটি হয়েছে, এই বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি তারা। দীর্ঘদিন ধরে এই কারখানায় কাজ করছেন, এমন কোনো ঘটনা এর আগে দেখেননি শ্রমিকেরা।
কারখানায় শ্রমিক অসুস্থতার ঘটনায় জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও শিল্পপুলিশের পক্ষ থেকে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে, ময়মনসিংহের কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতরের উপমহাপরিদর্শককে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি, সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি,পরিবেশ অধিদফতরে উপপরিচালকের প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ শিল্পপুলিশ-৫ এর পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি ও ময়মনসিংহের ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক। এই কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এসকিউ কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মেজর (অব:) সাব্বির হোসেন জানান, যে সেকশনে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়েছিল, সেই সেকশনটি দু’দিনের জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য সেকশন যথারীতি চালু রয়েছে। মালিক পক্ষের নির্দেশ ছাড়া এর বেশি কিছু বক্তব্য দিতে নিষেধ রয়েছে বলে তিনি জানান।
সিভিল সার্জন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে, ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) হাসানুল হোসাইনকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন, অর্থোপেডিক্সের চিকিৎসক সোহেল রানা ও মেডিক্যাল অফিসার মাসুদ পারভেজ। এই কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বেশ কিছু সুপারিশসহ তাদের তদন্ত প্রতিবেদন সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে বলে ওই কমিটির প্রধান জানান।
তিনি আরো বলেন, পরপর দুই দিনে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এসকিউ কারখানায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে গত শনিবার সকালে কারখানায় ‘গণমনস্তাত্ত্বিক’ রোগে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। পরে তাদেরকে প্রাথমিক ভাবে ওই কারখানায় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে তাদেরকে আল হেরা হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এসব রোগীদের সবার সাথেই কথা হয়েছে। দু’জন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বাকিরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
শিল্পপুলিশের পক্ষে করা তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো: জাহাঙ্গীর আলম জানান, কারখানায় শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার বিষয়ে তারা তদন্ত কাজ শুরু করেছেন, আপডেট পাওয়ার পর জানাবেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী জানান, কারখানায় শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ওই কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।