হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে গেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা এবং আরএসও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করেছে। আধিপত্য বিস্তারে তারা চাঁদাবাজি, অপহরণ, ক্যাম্পে আগুন দিয়ে নাশকতা ও খুনের মতো নৃশংস ঘটনার জন্ম দিচ্ছে প্রতিনিয়তই।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফের গহিন পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই দুই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে এক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। গত মঙ্গলবার বেলা ৩টায় টেকনাফের হ্নীলা আলীখালী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর দু’দিন আগে উখিয়ার ক্যাম্পে গলা কেটে হত্যা করা হয় আরেক রোহিঙ্গা নেতাকে (মাঝি)। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ফের রোহিঙ্গা যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এসব ঘটনায় আরসা সন্ত্রাসী গ্রুপ জড়িত বলে দাবি নিহত স্বজনদের। এ ঘটনায় পুলিশ এরই মধ্যে কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। তখন প্রাণ বাঁচাতে এক কাপড়ে এসেছেন অনেক রোহিঙ্গা। এখন প্রতিনিয়ত ক্যাম্পগুলোতে ঘটছে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, হামলা-মারামারির মতো ঘটনা। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মতো স্থানীয়রাও শঙ্কিত। এর ফলে দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে পুরো কক্সবাজার। নিয়মিত অপরাধ সংঘটিত হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে অপরাধীরা। কেউ কেউ কাজের সন্ধানে থাকলেও এসব রোহিঙ্গার অনেকে পর্যটন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। গত ১৪ জানুয়ারি পর্যটন শহরের আবাসিক হোটেলে রোহিঙ্গা তরুণীর বিয়ে উপলক্ষে শতাধিক রোহিঙ্গার উপস্থিতি নিয়ে ফের আলোচনায় এসেছে ক্যাম্পবাসীদের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি। এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর সৈকতের লাবণী পয়েন্টে একদল পর্যটকের সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া তরুণরাও ছিল রোহিঙ্গা। ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা পর্যালোচনা করে রোহিঙ্গাদের কারণে নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়টি প্রতিনিয়িত সামনে আনছে স্থানীয়রা। ক্যাম্প ছেড়ে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে এপিবিএনও।

জেলা পুলিশের তথ্য মতে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, অস্ত্র, মাদক এবং খুনসহ ১১ অপরাধের ঘটনায় গেল চার মাসে ৫৯১টি মামলা হয়েছে রোহিঙ্গা অপরাধীদের বিরুদ্ধে। যেখানে আসামি করা হয়েছে এক হাজার ৭৬২ জনকে। মোট মামলার ২৬২টিই মাদকসংক্রান্ত। হত্যা মামলা রয়েছে ৫৫টি।
কক্সবাজার জেলা বারের আইনজীবী বাপ্পী শর্মা বলেন, রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে নানা অপরাধে জড়াচ্ছেন। সম্প্রতি আদালতে সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে রোহিঙ্গা অপরাধের। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে এবং শৃঙ্খলাবাহিনী আরো একটু সচেতন হলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকার মতে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অপরাধ নতুন কিছু নয়। তাদের হাতেই প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরি, পর্যটক ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ। তবে হোটেল-মোটেল জোনে আবাসিক ফ্ল্যাট ভাড়া করে তরুণ-তরুণীদের বিয়ের আয়োজন সবাইকে বিস্মিত করেছে। রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ থাকলে পর্যটন শহর অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এসব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পর্যটন খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। রোহিঙ্গাদের অপরাধের বিচার দ্রুত করা গেলে অপরাধ কিছুটা কমত।

এ দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই। রোহিঙ্গারা ইচ্ছেমতো ক্যাম্প থেকে বের হচ্ছে। তাদের কারণে আতঙ্কে স্থানীয়রা। রোহিঙ্গা অপরাধীরা ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধ করে মিয়ানমারে কিংবা আমাদের গ্রামে-শহরে আত্মগোপন করে। আবার কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে অপরাধ করে ক্যাম্পে এসে গা-ঢাকা দেয়। ফলে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএনের চোখ কিভাবে ফাঁকি দিচ্ছে রোহিঙ্গারা?
ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি আমীর জাফর বলেন, কিছু কিছু স্থানে রোহিঙ্গারা কাঁটাতার কেটে সুড়ঙ্গ করে শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক অপরাধী গ্রেফতার এড়াতে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে মিয়ানমারে আত্মগোপন করতে পারে। ক্যাম্পগুলো পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সহজে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। ১৪ এপিবিএন-এর অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, আমাদের প্রচেষ্টার মাঝেও অনেক রোহিঙ্গা চোখ ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছে।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো অপরাধ নেই যা করছে না রোহিঙ্গারা। গেল চার মাসে ১১ ধরনের অপরাধের ঘটনায় ৫৯১টি মামলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতরে অবহিত করেছি। এ দিকে জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, নানা কারণে রোহিঙ্গা এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। প্রত্যাবাসন ছাড়া রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যাটি সমাধান কঠিন।