আরাকানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির সংঘর্ষে উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মিয়ানমারের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটছে। চেষ্টা করছে বাংলাদেশে প্রবেশেরও। সংঘর্ষের সময় গুলির খোসা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে পড়ায় সেখানকার লোকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি দুই পক্ষের ৭ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ওপার থেকে গুলির খোসা এসে বাংলাদেশের কয়েকটি গ্রামে পড়ে। সে সময় এসব গ্রামের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। ফিরে এসে পথে পথে গোলার খোসা দেখতে পান। গুলির এসব খোসা পাওয়া যায় সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু, কোনারপাড়া, মধ্যমপাড়া, উত্তরপাড়া, হেডম্যানপাড়া ও বাইশফাঁড়ি এলাকায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তুমব্রু মধ্যমপাড়ার সরওয়ার কামাল, হেডম্যান পাড়ার পাইনছা প্রু তংচঙ্গা ও আলী আকবর জানান, তারা এখন বড় অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। সোমবার সকাল ৬টা থেকে সীমান্তের ওপাড়ে ৭ ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। গোলাগুলি থেকে বেশ কিছু গুলি এসে পড়ে তাদের বাড়ি-ঘরে, উঠানে, মাঠে-ঘাটে।
সরওয়ার কামাল বলেন, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গোলাগুলির সময় তার বাড়িতে দু’টি একে-৪৭ রাইফেলের গুলি এসে পড়ে। প্রথম গুলি এসে পড়ার ২ মিনিটের মাথায় এসে পড়ে আরেকটি গুলি। চরম আতঙ্কে ছেলে সন্তান নিয়ে কোনো মতে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যত্র অবস্থান নিতে হয় তাদের।
হেডম্যানপাড়ার পাইনছা প্রু তংচঙ্গাও একই কথা বলেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তার গ্রামের কয়েকজন পুরুষ ছাড়া সবাই বাড়ি থেকে নিরাপদ স্থানে চলে যান। সন্ধ্যায় তারা আবার বাড়িতে ফিরে আসেন। তার ধারণা, প্রাণে বাঁচতেই তাদের এ সিদ্ধান্ত।
স্কুলশিক্ষক ছৈয়দুর রহমান হীরা জানান, তিনি সীমান্তের একটি স্কুলের শিক্ষক। তার স্কুল এলাকায় সারা দিন বৃষ্টির মতো গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেছে। ভয়ে শিশুরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি করেছে। ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা স্কুলে আসে। এভাবে আর কত দিন চলবে? তিনি এসবের প্রতিকার চান।
সীমান্তের একাধিক বাসিন্দা জানান, ৩৪ থেকে ৩৬ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকার ওপারে মিয়ানমারে ২২ জানুয়ারি ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৭ ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। এ সময় হাজার হাজার রাউন্ড গোলাগুলির শব্দ কানে আসে। সীমান্তে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এ ঘটনা তাৎক্ষণাৎ প্রশাসনকে জানানো সম্ভব হয় না। নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হয়।
ঘুমধুমের তুমব্রু গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান জানান, সীমান্ত এলাকার মানুষের ঘুম ভেঙেছে মিয়ানমার অভ্যন্তরে চলা গোলাগুলির তুমুল শব্দে। ঘুমধুম ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলম বলেন, গোলাগুলির প্রবল আওয়াজে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সীমান্তের কাছাকাছি থাকা চাকমাপাড়ার লোকজন। তারা অনেকেই তাদের পাড়া ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। তিনি আরো জানান, এলাকার লোকজন মারফতে শুনেছেন মিয়ানমার থেকে অনেকগুলো বিস্ফোরিত গুলির খোসা চাকমাপাড়ার ঘরের চালের ওপরে, উঠানে ও চাষকৃত জমিতে এসে পড়েছে। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তিনি গোলাগুলির খবর শুনে বিকেলে ঘটনাস্থলে গেছেন। মিয়ানমার অংশ থেকে শত শত গুলি তার ইউনিয়নে এসে পড়েছে। সেখানের অনেকে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে সন্ধ্যার দিকে আবার নিজ বাড়িতে ফিরেছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন বলেন, গোলাগুলিসহ অন্যান্য খবর শুনেছি। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
ব্যবসায়িক কাজে কক্সবাজারের কয়েকজন মিয়ানমারে রয়েছেন। তাদের থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষের পর আরাকান আর্মি ফুমালি গ্রামে আশ্রয় নেয়। সে সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ওই গ্রামে আর্টিলারি গানসহ ভারী অস্ত্রের গোলা ছুড়তে থাকে। এই সংঘর্ষে শতাধিক রোহিঙ্গা হতাহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাখাইন থেকে পাওয়া তথ্য মতে, আহত রোহিঙ্গাদের বুচিডং হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আবার অনেকেই মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনে আশ্রয় নিচ্ছে।
মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার লোকজন জানায়, গত সোমবার থেকে পশ্চিম রাখাইনে শুরু হওয়া গোলাগুলিতে সীমান্তের এপারে তুমব্রু এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন। সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায়ই বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে গোলাগুলির প্রভাব এপারে থাকাটা স্বাভাবিক। তবে বিজিবি, গ্রাম পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা সতর্ক রয়েছেন। ৩৪ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিজিবি সব সময় সতর্ক আছে। সীমান্তে বসবাসরত গ্রামবাসীকে নিরাপদে রাখতে বিজিবি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তারা রাত-দিন কাজ করছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরআরসি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরুর পর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে প্রত্যাবাসনে ৮ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছিল। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৬৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা চূড়ান্ত করে তা বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিল মিয়ানমার।
কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প ও ভাসানচর মিলিয়ে দেশে বর্তমানে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।



