থাইল্যান্ড সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার অবতরণের প্রস্তুতিকালে গুলি করে ভূপাতিত করেছে স্নাইপাররা। এতে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ দেশটির সেনাবাহিনীর পাঁচ সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
মিয়ানমার আর্মির বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে ইরাবতী। এ ছাড়া পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন বলেছে, সোমবার থাইল্যান্ড সীমান্তের মায়াবতী শহরের কাছে থিঙ্গানিনাউঙ্গ শহরে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আই মিন নাউং, তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দু’জন পাইলট। সূত্র বিস্তারিত না জানিয়ে বলেছে, স্নাইপাররা ওই হেলিকপ্টারে গুলি করার পর প্রথমে তারা আহত হন। তার মধ্যে কিছুক্ষণ পরে মারা যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাউং।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনীর সাথে জাতিগত বিদ্রোহীদের লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ থেকে বহু এলাকা তারা কেড়ে নিয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সাথে সেনাবাহিনীর তীব্র লড়াই হচ্ছে বলে বিভিন্ন মিডিয়া খবর দিয়েছে। সোমবারও সীমান্তের ওপারে ভারী গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। ফলে সীমান্ত এলাকায় কমপক্ষে ছয়টি মাদরাসা ও স্কুল বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সামরিক বাহিনী জাতিগত এই বিদ্রোহীদের সামনে দাঁড়াতে পারছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক জান্তা সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মিন্ট শয়ে সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মিয়ানমার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর মাধ্যমে অং সান সুচিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন সামরিক জান্তা অং মিন হ্লাইং। তার পর থেকেই এসব বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে থেমে থেমে লড়াই চলছিল; কিন্তু সম্প্রতি তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির (এএ) তীব্র লড়াই চলছে। এরই মধ্যে গত রোববার (২৮ জানুয়ারি) রাখাইনের মিনবিয়া শহরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৩৮০ ব্যাটালিয়নের সদর দফতর দখলে নেয়ার দাবি করেছে আরাকান আর্মি। মিয়ানমারের ইংরেজি দৈনিক ইরাবতীর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাখাইনের ম্রাউক ইউ, কিয়াকতাও ও রাথেডং এলাকায় জান্তা বাহিনীর সাথে এখনো আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক লড়াই চলছে।
এক বিবৃতিতে আরাকান আর্মি বলেছে, জান্তা সৈন্যরা এখন আমাদের সাথে মুখোমুখি লড়াই করতে পারছে না। তারা এখন আরো বেশি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালাচ্ছে। ম্রাউক ইউ শহরে সেনাবাহিনীর ৩৭৭ ও ৫৪০ ব্যাটালিয়ন ও পুলিশের ৩১ ব্যাটালিয়ন থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে। শনিবার (২৭ জানুয়ারি) জান্তা বাহিনীর গোলাবর্ষণে এই শহরের চার বাসিন্দা নিহত ও অন্ত ২০ জন আহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, জান্তা সৈন্যরা রামরি শহরে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। তবে শহরটিতে আরাকান আর্মির বিদ্রোহীদের সাথে সেনাবাহিনীর সম্মুখ লড়াইয়ের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার বুথিডং শহরেও উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে জান্তা সৈন্যরা আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে আরাকান আর্মি। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ২৩২ এবং ৩৪৪ ব্যাটালিয়ন সিত্তে ও মিনবিয়া শহরে গোলা বর্ষণ করেছে। সেখানকার বাসিন্দারা বলেছেন, মিনবিয়া শহরের খোয়া সোন গ্রামে সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণে অন্তত তিন বাসিন্দা গুরুতর আহত হয়েছেন। এর আগে, আরাকান আর্মির যোদ্ধারা ২৪ জানুয়ারি পাকতাও শহরের দখল নেন। এর পর থেকেই সেনাবাহিনী এই শহরে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ শুরু করে।
আরাকান আর্মি বলেছে, শনিবার রাতেও পাকতাও শহরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওয়াই-১২ সামরিক পরিবহন বিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি মিয়ানমারের শাসনে থাকতে চায় না। তারা রাখাইন রাজ্যকে স্বীকার করে না। বিদ্রোহী গোষ্ঠী এই রাজ্যকে আরাকান বলে মনে করে। তাদের মতে, আরাকান একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। কিন্তু বার্মার রাজা আরাকান দখল করে রাজ্যটিকে দেশটির অন্তর্ভুক্ত করে।
আরাকানের স্বাধীন সত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। সম্প্রতি তারা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পালতোয়া। গত বছরের নভেম্বরে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ চিন রাজ্যের পালেতওয়া ও উত্তর রাখাইনে জান্তা বাহিনীর ১৬০টিরও বেশি ঘাঁটির দখল নিয়েছে আরাকান আর্মি। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে পালতোয়ার দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
মিয়ানমারের রাখাইনে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারাও আতঙ্কে রয়েছেন। এতে কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা রাখাইনে অবস্থানরত স্বজনের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তবে নতুনভাবে যাতে একজন রোহিঙ্গাও আর এ দেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সোমবার কক্সাজারে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, মিয়ানমারের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের এপারে ‘অনুকূল’ পরিবেশ থাকায় ওপাশ থেকে রোহিঙ্গারা যাতে এ দেশে ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশের ওপর। নতুন আর কাউকে জায়গা দেয়া বাংলাদেশের পক্ষে কষ্টসাধ্য এই বার্তা রোহিঙ্গাদের দিতে হবে।
চলমান পরিস্থিতিতে সব বাহিনীর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে কোর কমিটির সভায় জোর দেয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বৈঠক সূত্র জানায়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে জানাতে বলা হয়। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে যাতে মাদকসহ সীমান্ত হয়ে কোনো চোরাচালান পণ্য দেশে না ঢোকে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকারও কথা বলা হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকেও (এপিবিএন) সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে। ক্যাম্পে খুনাখুনি রোধে গোয়েন্দা তথ্য বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত এলাকার মানুষ মর্টার শেল এবং গোলাগুলির আওয়াজে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তে ২৪টি মর্টার শেলের হামলার পাশাপাশি মিয়ানমারের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সাথে সেনাবাহিনীর ব্যাপক গোলাগুলি চলে। এ পরিস্থিতিতে সকালে ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত এলাকার আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দু’টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদরাসা। বান্দরবান জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনী বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তুমব্রু সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমধুমের বাজার পাড়া, বাইশ ফাঁড়িসহ তুমব্রু রাইটে মর্টার শেল এবং ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। মর্টার শেলের খোসা বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরিত অংশ গতকাল দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রুর পশ্চিম কূল এলাকায় বসবাসকারী বাহাদুল্লাহর বাড়ির উঠানে এসে পড়েছে বলে জানান তার স্ত্রী খালেদা বেগম। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
তুমব্রু সীমান্তের কোনাপাড়ায় বসবাসকারী শাহাজান মিয়া বলেন, ‘মিয়ানমারের ভেতরে সকাল থেকে গুলির বিকট শব্দে এপার কেঁপে উঠছে। এখনো ব্যাপক মর্টার শেলের শব্দ হচ্ছে। ২৪টি মর্টার শেলের শব্দ পেয়েছি।’ টেকনাফ সীমান্তে বাংলাদেশের নলবিল গ্রামে গোলাবারুদ ও মর্টার শেল পড়েছে। ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি আমির জাফর বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে নতুন কোনো রোহিঙ্গা যেন ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে, সে জন্য চেকপোস্ট ও ক্যাম্পে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।’
এ দিকে আরাকান আর্মি রোববার রাখাইন রাজ্যের মিনবিয়া শহরের পালেতোয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৩৮০ ব্যাটালিয়নের সদর দফতর দখলে নিয়েছে। রাখাইনের ম্রাউক ইউ, কিউকটা ও রাথেডং এলাকায় দু’পক্ষের লড়াই চলছে। আরাকান আর্মির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘জান্তার আর আমাদের সাথে লড়াই করার সামর্থ্য নেই। তারা এখন আরো বেশি গোলা নিক্ষেপ ও আকাশ থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে।’



