মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ চলছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিসহ (এএ) কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর। এ লড়াইয়ে টিকতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে আরো ৬৩ সীমান্তরক্ষী আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। গতকাল তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে গত মঙ্গলবার আরো ২৬৪ জন আশ্রয় নিয়েছিল। দু’দিনে আশ্রয় নেয়া সীমান্তরক্ষীর সংখ্যা ৩২৭ জনে উপনীত হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের চলমান সঙ্ঘাতের জেরে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৩২৭ জন সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে বিজিপি সদস্য ছাড়াও সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্যসহ বেসামরিক নাগরিকরা রয়েছেন। যারা অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়েছে। স্থানীয় কেউ কেউ প্রশ্ন রেখেছেন, এমন পরিস্থিতিতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদেরকে কী হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ? যুদ্ধবন্দী নাকি শরণার্থী? প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে চলা বাংলাদেশের সামনে এটি নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে।
মিয়ানমারে মর্টার শেল, বোমা বিস্ফোরণে কাঁপছে পুরো সীমান্ত এলাকা
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে থেমে থেমে গোলাবর্ষণ এবং মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনায় চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হাজার হাজার মানুষ। রাতে যেমন তারা ঘরে থাকতে পারছেন না, দিনের বেলায়ও অনেকটা পালিয়ে থাকার মতো অবস্থা। বিশেষ করে রাত যত গভীর হয় তত গুলির শব্দ আরো নিকটে চলে আসে। এমনকি চলে মর্টার শেল নিক্ষেপ। ফলে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন থেকে শুরু করে টেকনাফের হোয়াইক্যং এবং হ্নীলা ইউনিয়ন পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি ও মর্টার শেলের বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। বিশেষ করে তুমব্রু সীমান্তে দু’জনের মৃত্যুতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে দ্বিগুণ। গতকাল বুধবার তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা না গেলেও উখিয়ার রহমতেরবিল সীমান্ত এলাকার মাস্টার আজিজ উল্লাহ বলেছেন, সকাল থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢেঁকিবনিয়া ও চাকমা পাড়া এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠেছে এপারের রহমতেরবিল সীমান্ত এলাকা।
হাতবোমায় ৪ বাংলাদেশী আহত : এদিকে সীমান্তে উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে ওপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজনও অস্ত্র নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশ করছে বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার উখিয়ার পালংখালী সাতটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় অস্ত্রসহ ২৪ জনকে আটক করেছেন স্থানীয়রা। অনুপ্রবেশে বাধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ছোড়া হাতবোমার আঘাতে আহত হয়েছেন চারজন। তারা হলেন উখিয়া উপজেলার থাইংখালী গ্রামের মোবারক, আয়ুবুল ইসলাম, কালু ও আব্বু।
থাইংখালী পুটিবনিয়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল বশর বলেন, ‘২৪ যুবক একটি ডিঙি নৌকায় করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর স্থানীয়রা তাদের মিয়ানমারের পুলিশ মনে করেন। কিন্তু কাছে এলে দেখা যায় তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য। পরে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দিলে তাদের একজন হাতে থাকা বোমা ছুড়ে মারে। এতে চার যুবক আহত হন। পরে তাকে ধরে গণধোলাই দেন স্থানীয়রা।’
সীমান্তের ১৩ গ্রামের হাজারো মানুষ ঘর ছেড়েছে : নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্রু-থাইংখালি-পালংখালী সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষকালে ছুটে আসা মর্টারশেল ও ভারী অস্ত্রের বর্ষণে কাঁপছে দেশের ২০ কিলোমিটার সীমান্ত। উত্তপ্ত সীমান্ত পরিস্থিতে বাংলাদেশের ১৩ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ওই সব এলাকায় এখন চোরের উপদ্রব বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ দিকে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তিনি বান্দরবান জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঘমধুম ও তুমব্রু গ্রামের সবাইকে নিরাপদে সরে যেতে বলেছেন। তিনি বলেন, যাদের কোথাও আশ্রয়ের সুযোগ নেই, তাদের জন্য ২টি অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাদের খাবারসহ সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গ্রামের লোকজনকে নিরাপদস্থল উত্তর ঘুমধুমের বড়বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অস্থায়ী করে সেখানে চলে যেতে বলা হয়।
ডিসি এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজের নির্দেশে স্থানীয় লোকজনকে সরে যেতে বলা হয়েছে। ঘুমধুম ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১নং উত্তর ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জনগণের জন্য আশ্রয়শিবির হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যারা অর্থাভাবে আশ্রয়শিবিরে যেতে পারছেন না তাদের গাড়ি ভাড়ার জন্য চেয়ারম্যান টাকা দিচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দুই নাম্বার ওয়ার্ডের আনসার সদস্য আমির বশর।
বিদ্রোহী গ্রুপ ও মিয়ানমার সেনা ও বিজিপির মধ্যে সংঘর্ষের সূত্র ধরে মিয়ানমারে বসবাসরত কিছু রোহিঙ্গা নাফনদী পাড়ি দিয়ে ও স্থলপথে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সুযোগ নেয়ার প্রচেষ্টায় রয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাত ৮টা নাগাদ হতে ঘুমধুম ও তুমব্রুসহ সীমান্তের ১৩ গ্রামের বাড়িঘর ফাঁকা হয়ে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া গ্রামগুলোতে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে বাড়ি পাহারার জন্য পুরুষরা থাকলেও তারা বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না।
এমতাবস্থায় পাশের অনেক রোহিঙ্গাকে সেসব এলাকাতে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। রাতে চোর-ডাকাতের বিচরণ বেড়ে গেছে।
গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা ভয় পাচ্ছেন চোর-ডাকাতের। কখন কারা এখানে হানা দেবে বলে আতঙ্কে রয়েছেন তারা।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, তিনি বিষয়টি বিবেচনায় এনে গত দুই দিন ধরে সীমান্তের গ্রামগুলোতে পুলিশি টহল বৃদ্ধি করেছেন। রাতে এ অভিযান আরো সতর্কতার সাথে করা হচ্ছে। যেন বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়া লোকজনের যান-মাল নিরাপদ থাকে।
যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি তৎপর : সীমান্তে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদা তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
গতকাল কক্সবাজার রিজিয়নের আওতাধীন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিদর্শনকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘুমধুম উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এদিন সকালে মহাপরিচালক বিজিবির কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু ও ঘুমধুম সীমান্ত এবং তৎসংলগ্ন বিওপি পরিদর্শন করেন।
এসময় তিনি সীমান্তে দায়িত্বরত সব পর্যায়ের বিজিবি সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের সাথে মতবিনিময় করেন। পরিদর্শনকালে তিনি দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সীমান্তে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সদা তৎপর থাকার নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্বরত সব বিজিবি সদস্যের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
বিজিবি মহাপরিচালক মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘর্ষের জেরে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), মিয়ানমার সেনাবাহিনী, ইমিগ্রেশন সদস্য, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সব সদস্য খোঁজখবর নেন এবং আহত অবস্থায় আসা ও হাসপাতালে চিকিৎসারত বিজিপি সদস্যদের দেখতে যান।
পরে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ধৈর্যধারণ করে, মানবিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, অবৈধভাবে আর একজনকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ সময় বিজিবি মহাপরিচালকের সাথে বিজিবি সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার, রামু সেক্টর কমান্ডার ও কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়কসহ বিজিবির অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষের জেরে এখন পর্যন্ত দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি), মিয়ানমার সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইমিগ্রেশন সদস্য ও অন্যান্য সংস্থার ২৬৪ জন সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদেরকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।



