বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে আন্দোলন, সেই আন্দোলন শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তা বাংলা ভাষার মুক্তি থেকে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। এজন্য বলা হয়, ভাষা আন্দোলনই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ। এর মাধ্যমেই মূলত বাঙালিরা পাকিস্তানি শাসকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, এ দেশের মানুষ পরাধীন নয় বরং স্বাধীনতাকে আপন করে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে।
মূলত ভাষা আন্দোলন সূচনার পেছনে কংগ্রেস নেতারা কাজ করলেও এটি খুব দ্রুতই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। প্রশ্নটা রাষ্ট্রভাষা নিয়ে হলেও এ দেশের মানুষ শঙ্কিত হয়েছিল এই ভেবে যে, তাদের পূর্বপুরুষের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা হয়তোবা পাকিস্তানি শাসকরা কেড়ে নিতে চায়। আর এই শঙ্কা থেকেই প্রথমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং পরে স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে সাধারণ মানুষ। আর মানুষের এই আবেগ ও শঙ্কাকে শান দেয়ার জন্য যেসব রাজনৈতিক সংগঠন কাজ করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনকে শুধুমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং এটাকে মুক্তিযুদ্ধের বীজ হিসেবে রোপণ করতে কাজ করেছে। যেই বীজের ফসল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঘরে তুলেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে।
ভাষা আন্দোলনকে নিছক ভাষা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক বেষ্টনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ এটিকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। অনেকেই মনে করেন ভাষা আন্দোলনকে তাত্ত্বিক ও আদর্শিক পরিচালনা দান করেছিল কমিউনিস্ট পার্টি। বলা হয়ে থাকে আজকের বাংলাদেশী জাতীয়তার বুনিয়াদ তৈরি হয়েছে ভাষা আন্দোলনকে নির্ভর করে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে। ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা কমিউনিস্ট পার্টির পুরনো তত্ত্ব এবং এটা তাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ও জাতিসত্তার বিকাশের ধারণার সাথে যুক্ত। সুতরাং বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বের আলোকে বিকশিত হয়েছে। এই জাতীয়তাবাদ ঠিক ইউরোপীয় ঘরানার লিবারেল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়।
ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার পিছনে কমিউনিস্ট পার্টির পাশাপাশি কাজ করেছিল মুসলিম লীগের সেই বিদ্রোহী অংশটি, যারা পরবর্তীকালে মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ হয়ে ‘আওয়ামী লীগে’ পরিণত হয়েছিল। বস্তুত, আজকের বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শিক ও নৈতিক ভিত্তি একদিকে রুশীয় কমিউনিজম ও অন্যদিকে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। এই রাজনীতির হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ভাষা আন্দোলনকে সামনে রেখে কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগ কিভাবে কাজ করেছে তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় লেখক ড. মোহাম্মদ হান্নানের ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস : ১৮৩০ থেকে ১৯৭১’ বইয়ে।
তিনি লেখেন, তমদ্দুন মজলিস, মুসলিম ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও সংগঠনগুলোর উদ্যোগে সৃষ্ট ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হলে ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি নতুন ছাত্রসংগঠন ছাত্র আন্দোলনে আবির্ভূত হয়। এই সংগঠনটি ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলনের ছাত্র শাখা। কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক দিক দিয়ে ছিল অত্যন্ত সচেতন। হাওয়াকে নিজেদের দিকে প্রবাহিত করার অসীম দক্ষতা ছিল এদের। এর কারণ হলো রাজনীতির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মীদের সচেতন এবং দক্ষ করে তোলার প্রক্রিয়া এ সংগঠনে শুরু থেকেই অব্যাহত ছিল। যার ফলে তারা খুব সহজেই ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে পরবর্তীতে এ দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম করেছিল।



