মিয়ানমারের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিলতর হয়ে উঠছে। রাখাইনসহ অন্তত ৭টি রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সাথে যুদ্ধ চলছে আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর। তার প্রতিক্রিয়া এসে পড়ছে বাংলাদেশে। গতকাল শনিবার ভোর রাত থেকে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির বিকট শব্দ শোনা গেছে। ঘণ্টা দুয়েক ধরে এই গোলাগুলি চলে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। গুলির শব্দে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে বলে জানিয়েছেন তারা। গতকাল ভোরে হোয়াইক্যং মাঝের পাড়া সীমান্তের মসজিদের পাশের হাজী আবছারের মুদির দোকান ও ধলুমিয়ার বাড়িতে মিয়ানমার থেকে গুলি এসে পড়ার ঘটনা ঘটে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান ঘরের বাসিন্দারা। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ১০০ গজের পরই মিয়ানমার। ওই প্রান্তেও রাখাইনে বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। গতকালও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এ দিকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের পাশাপাশি জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। অন্য দিকে সীমান্ত লাগোয়া টেকনাফ- সেন্টমার্টিন নৌরুটে গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে প্রশাসন।
এ দিকে আটক মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যদের সাথে যোগাযোগে দোভাষি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে যা বলেছেন আমি তা দোভাষি হিসেবে বিজিবিকে বলেছি। তারা বলেছেন, আরাকান আর্মি আমাদের গুলি করে হত্যা করছে। আমাদের অনেক সৈন্য তাদের হাতে মারা গেছে। তাই আমরা প্রাণ বাঁচাতে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছি। আরাকান আর্মি সেখানে অনেক জনপ্রিয়। মাত্র ২৬ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলে বর্তমানে ৭ হাজারেরও বেশি সদস্যের আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত একটি বাহিনী। এদের সাথে পেরে ওঠা মুশকিল বলে সীমান্তরক্ষীরা অকপটে স্বীকার করেছেন।
জানা যায়, গতকাল শনিবার মিয়ানমারের কুমিরখালী সীমান্ত ফাঁড়িতে ভোর থেকে গোলাগুলি চলছে। মিয়ানমারের মর্টার শেল ও মুহুর্মুহু গুলিতে প্রকম্পিত হচ্ছে এপার। মিয়ানমারে লড়াইয়ের গুলি, মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। থেমে থেমে চলমান এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠা রয়েছে সীমান্তবাসী। শনিবার ভোর ৫টার দিকে শুরু হয় গোলাগুলি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক চলে গোলাগুলি। এ সময় ফজর নামাজ শেষে কুরআন তেলওয়াত করছিল হোয়াইক্যং মাজের পাড়ার হাজী মোহাম্মদ আবছার। হঠাৎ করেই পরপর ২টা গুলি এসে পড়ে হাজী আবছারের ঘরে। গুলি সামান্য পাশ দিয়েই চলে গিয়ে দেয়ালে ঠেকে। এতে অল্পের জন্য রক্ষা পায় হাজী আবছার। এ ছাড়াও হোয়াইক্যং উত্তর পাড়া হোছন আলীর মুদির দোকান ও সড়কের পাশে ধলুমিয়ার বাড়িতে গুলি পড়ে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সীমান্তবাসী।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, আমরা সীমান্তের কাছে বসবাস করি। সব সময় ভয়ে আছি। গোলাগুলি শব্দ ও ভয়ে এলাকার মানুষ সীমান্তের কাছে কাজকর্ম করতে যেতে পারছেন না। ভোর থেকে হোয়াইক্যং পয়েন্টের মিয়ানমারের ওপারে শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। ওপারে চলা গুলি থেকে ৪টি গুলি এপারে হোয়াইক্যং উত্তর পাড়া হোছন আলীর মুদির দোকান, আরো একটি গুলি পড়ে হাইওয়ে রোডের পাশে হোয়াইক্যং মাঝের পাড়া আবসারের বাড়িতে, উত্তর পাড়া মানিকের বাড়ি ও ধলুমিয়ার বাড়িতে পড়ে। বিজিবি জানায়, মিয়ানমারের বিলাই চাড় দ্বীপে গোলাগুলি ও ফায়ারিংয়ে ঘণ্টা খানেক শব্দ হয়। সেইখানে বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে নবী হোছন গ্রুপের সাথে এ গোলাগুলি হয়। নবী হোছন গ্রুপ বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষে আশ্রয় নেয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হোয়াইক্যং বিওপির কোম্পানি কমান্ডার আবু জানান, গোলাগুলির শব্দ ও সেই কয়েকটি বুলেট এপারে এসেছে বলে শুনেছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এ দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু এলাকা থেকে অক্ষত অবস্থায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া অবিস্ফোরিত আরো ১টি মর্টার শেল উদ্ধার করেছে বিজিবি। এ নিয়ে অক্ষত অবস্থায় দু’টি মর্টার শেল উদ্ধার করে তুমব্রু সড়কের পাশে নিরাপদ স্থানে রেখেছে তুমব্রু বিওপির সদস্যরা। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় তুমব্রু-ঘুমধুম সড়কের ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা হতে অক্ষত অবস্থায় এ মর্টার শেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বিজিবি ও স্থানীয়রা জানান, সকালে ব্রিজের পাশে অবিস্ফোরিত মর্টার শেলটি দেখেন পথচারী ও এলাকাবাসীরা। পরে বিজিবিকে খবর দিলে মর্টার শেলটি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। এ নিয়ে মোট ৩টি মর্টার শেলের অবিস্ফোরিত গোলা উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মর্টার শেলের গোলাটি নিরাপদ স্থানে রেখেছে তুমব্রু বিওপির সদস্যরা।
উল্লেখ্য, গতকাল তুমব্রু সীমান্তের ৩৪ পিলার পাশে এক জমি থেকে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল উদ্ধার করে বিজিবি। এ নিয়ে মোট ৩টি মর্টারের অবিস্ফোরিত মর্টার শেলের গোলা উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে একটি শুক্রবার সকালে সেনা বোমা বিশেষজ্ঞ দল ধ্বংস করে দেয়।
এ ছাড়া সীমান্তের তুমব্রু, ঘুমধুম এলাকায় পরিস্থিতি ভালো। কিন্তু শুক্রবার গভীর রাতে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, সীমান্তে গোলাগুলি কমলেও মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে ছোড়া মর্টারের গোলা বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকায় এখন বোমা আতঙ্কে রয়েছে লোকজনের। ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান জাহাংগীর আজিজ বলেন, এখন পরিস্থিতি ভালোর দিকে। তবে কোন সময় কী হয়ে যায় তা বলা মুশকিল। তা ছাড়া ক্ষেত-খামারসহ বিভিন্ন জায়গায় অবিস্ফোরিত মর্টারের গোলা পড়ে থাকায় লোকজন এখনো শঙ্কিত।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জাহাজ চলাচল বন্ধ : রাখাইনে জান্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্ঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে সীমান্ত লাগোয়া টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে গতকাল শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে প্রশাসন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী সকল জাহাজ চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে গত বুধবার রাতে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গত বুধবার বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন্স দ্বীপের সাথে অনুমতি সাপেক্ষে জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
গ্রেফতার ২৩ রোহিঙ্গার রিমান্ড চায় পুলিশ : এ দিকে অস্ত্রসহ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের ২৩ নাগরিককে আদালতে সোপর্দ করা হয়। উখিয়া থানা পুলিশ গতকাল বিকেলে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ফাহমিদা সাত্তারের আদালতে সোপর্দ করে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।
উখিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো: শামীম হোসেন জানান, মিয়ানমারের এই নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আগামীকাল রোববার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ডের শুনানি করবেন। তিনি জানান বিজিবি বাদি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। তিনি জানান, এ সংক্রান্ত মামলায় বিভিন্ন ধরনের ১২টি অস্ত্র ও ১৯৫ রাউন্ড গুলি বিজিবির পক্ষে পুলিশকে সোপর্দ করা হয়েছে। ২৩ জন সবাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রেজিস্ট্রেশন হওয়া বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক বলে জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার ভোর ও রাতে সীমান্ত দিয়ে কিছু অস্ত্রধারীরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। যাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় লোকজন আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিল।
গোলাগুলির মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে এসএসসির প্রস্তুতি : সীমান্তে গোলাগুলির মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি করছেন প্রশাসন। কেন্দ্রটি ঘুমধুম সীমান্তের পাশে হওয়ায় মিয়ানমার বিদ্রোহী-জান্তা সরকারের মধ্যকার গোলাগুলি হলেই কেঁপে ওঠে স্কুল আঙ্গিনাসহ পুরো এলাকা। স্কুল এলাকায় কয়েকটি মর্টার শেল ও ২টি রকেট লঞ্চার এসে পড়ে স্কুলের পাশে। এর মধ্যে ১টি রকেট লঞ্চার পড়ে বাংলাদেশীসহ ২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় এক শিশু। আরেকটা অবিস্ফোরিত রকেট লঞ্চার এসে পড়ে ঘুমধুম উচ্চবিদ্যালয়ের পাশে নয়াপাড়ায়। স্থানীয় লোকজন জানান, মিয়ানমারের সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে সপ্তাহ দেড়েক ধরে গোলাগুলিতে ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত পয়েন্ট উত্তপ্ত ছিল। এ দিকে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে ধোঁয়াশায় পড়ে ঘুমধুম উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকরা।



