ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের নাম ভাষাশহীদ আবদুস সালাম। তিনি ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামানুসারে পরবর্তীতে ওই গ্রামের নামকরণ করা হয় সালামনগর। তার পিতার নাম মোহাম্মদ ফাজেল মিয়া ও মাতার নাম দৌলতের নেছা। ফাজেল মিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ইরাকের বসরায় কর্মরত ছিলেন। শহীদ সালাম কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর তৎকালীন মাতুভূঁই কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে (বর্তমানে মাতুভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়) অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আতাতুর্ক মডেল হাইস্কুলে (তৎকালীন দাগনভূঞা আতাতুর্ক হাইস্কুল) ভর্তি হন এবং সেখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আর্থিক অনটনে পরবর্তীতে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।
শহীদ সালামের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পর তিনি কলকাতা গমন করেন এবং সেখানে মেটিয়াবুরুজে তার বড় বোনের স্বামী আবদুল কাদেরের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরে কাজ শুরু করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আজিমপুরে (পলাশী ব্যারাক) ৩৬বি নং কোয়ার্টারে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের ‘পিয়ন’ হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে যে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। পরে ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ এলোপাতাড়িভাবে গুলি চালালে অন্যদের সাথে আবদুস সালামও গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৫২ সালের ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখায় তাকে বাংলাদেশ সরকার অনেক সম্মাননা প্রদান করেছে। সেগুলো হলো, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম যুদ্ধ জাহাজ ‘বানৌজা সালাম’ তার নামে নামকরণ করা হয়। সরকার তাকে ২০০০ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করে। ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ২০০০ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়ামে’ রূপান্তর করা হয়। দাগনভূঞা উপজেলা মিলনায়তনকে ২০০৭ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়। ২০০৮ সালে ‘ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ সালাম নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে তার নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে ‘সালাম নগর’ রাখা হয়। ২০০৯ সালে এটি সরকারি নথিভুক্ত হয়। ‘ভাষা শহীদ আবদুস সালাম হল’ নামে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবাসিক ছাত্র হল প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ভাষা শহীদ সালামের নামে দাগনভূঞা উপজেলার সালামনগরে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ভাষা শহীদ সালাম মেমোরিয়াল কলেজ’।



