বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে যুবকদের যেমন অবদান রয়েছে তেমনি শিশু-কিশোরদেরও ভূমিকা আছে। ভাষার জন্য জীবন দানকারী শহীদদের মধ্যে শহীদ অহিউল্লাহও অন্যতম। তবে ছাত্র-যুবক শহীদদের ভিড়ে এই শিশু শহীদের স্মৃতি আজ অনেকটাই বিস্মৃত। বর্তমান প্রজন্ম রফিক, জব্বার সালামদের মনে রাখলেও শিশু অহিউল্লাহকে খুব কম লোকই মনে রেখেছে। তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় অহিউল্লাহর সমন্ধে লেখা হয়েছিল।
বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হালকা পাতলা গড়নের অহিউল্লাহ ছিল দুরন্ত প্রকৃতির। মাথাভর্তি ছিল ঝাঁকড়া চুল। সারা দিন ঢাকা শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়ানো আর ছবি আঁকাই ছিল তার কাজ। দরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়া অহিউল্লাহর পিতা তার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শত অভাবের সংসারেও ছেলেকে ভর্তি করিয়েছিলেন স্কুলে। মাত্র তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল অহিউল্লাহ। ছেলে অহিউল্লাহ পাক সৈন্যদের বুলেটে শহীদ হওয়ার পর লাশটিও পাননি পিতা।

দৈনিক আজাদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রসমাজ যখন শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল তখন পাকিস্তানি পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে ছাত্ররা শহীদ হন। পুরো ঢাকা শহর তখন থমথমে ও গুমোট পরিবেশ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে পাকিস্তানি সৈন্যদের টহল চলছে। পুরো নবাবপুর রোড এলাকা সুনসান নীরবতা। লোকজনের মাঝে অজানা আতঙ্ক ভর করেছে। মাঝে মধ্যে দু-চারটা গাড়ি যাচ্ছে এদিক-ওদিক। ভাষার দাবিতে পাকসৈন্যদের গুলিতে হত্যার শিকার রফিক, জব্বার, বরকতদের লাশ নিয়ে শোক মিছিল বের করে ছাত্ররা। ছাত্রদের মিছিল আর স্লোগানে স্লোগানে নবাবপুর এলাকার আকাশ বাতাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

নবাবপুর এলাকা যখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত। ঠিক তখন ওই এলাকার খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে আনুমানিক ৯ বছর বয়সের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনেই ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের গাড়ি। জলপাই রঙের পোশাক পরিহিত পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল ছেলেটির দেখা এলাকায় নতুন আগন্তুক। এমন বিচিত্র পোশাকের মানুষ ছেলেটি জীবনে প্রথম দেখেছে। ৯ বছরের ছেলেটি জানে না তারা কারা। তার আবার ছিল ছবি আঁকার শখ। ছেলেটি পকেট থেকে একটি সাদা কাগজ বের করে জলপাই রঙের পোশাক পরিহিত সৈন্যদের ছবি আঁকার প্রস্তুতি নেয়। শিশুটি মিছিল দেখামাত্র ছবি আঁকার কাগজ নিজের মুখে পুরে মিছিলে যোগ দেয়।
মিছিলটি কয়েক হাত সামনে এগোতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা আকস্মিক গুলি ছুড়তে শুরু করে। সৈন্যদের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান, ছাব্বিশ বছরের আব্দুল আউয়াল নামের একজন নিরীহ রিকশাচালক এবং ৯ বছরের অহিউল্লাহ। ঘাতকের বুলেটে তার মাথার খুলি উড়ে যায়। এ অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিলটি। ঘাতকরা তিনটি লাশ নিয়ে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার সময় শিশুটির পরিচয় জানার চেষ্টা চলে। শিশুর লাশটির প্রত্যক্ষদর্শী ডা: মেজর (অব:) মাহফুজ হাসান লাশের বুক পকেটে প্রজাপতি, ফুল, পাখি, জীবজন্তু আঁকা কিছু কাগজ পান।

তিনি প্রথমে শিশুটির নাম জানতে পারেন শফিউল্লাহ। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক পর নিশ্চিত হওয়া যায় নিহত ওই শিশুর নাম শফিউল্লাহ নয়, অহিউল্লাহ। শিশুটির বাবা রাজমিস্ত্রি। নাম মো: হাবিবুর রহমান। পরিচয় চিহ্নিত হওয়ায় পিতাকে খবর দিয়ে আনা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অহিউল্লাহর বাবা হাবিবুর রহমান নিজ ছেলের লাশ নিতে চাইলেও পাক সৈন্যরা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। অহিউল্লাহর লাশ সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত গোপনে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করে।
ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় অহিউল্লাহর শহীদ হওয়ার ঘটনাটি প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘সৈনিক’ নামের একটি পত্রিকা। ওই পত্রিকায় ভাষাশহীদদের তালিকায় অহিউল্লাহর নাম ছিল। চিত্রশিল্পী শ্যামল বিশ্বাস অহিউল্লাহর পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী প্রবীণদের কাছে অহিউল্লাহর শারীরিক বর্ণনা শুনে ছবি আঁকার কাজ শুরু করেন। এর আগে পরিবারের লোকজনদের কাছে বর্ণনা শুনে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের ছবি এঁকেছিলেন ভাস্কর রাশা। সালাম, বরকত রফিক, জব্বার, শফিউরদের নাম সবাই জানি। কিন্তু ভাষা শহীদ শিশু অহিউল্লাহ অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছেন ইতিহাসের পাতা থেকে।