ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল অপরিহার্য ভূমিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের অধিকার আদায়ে যে বলিষ্ঠ সংগ্রামের সূচনা হয় তা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকেই। একই সুতোয় বাঁধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাষা আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের সূতিকাগার। পাকিস্তানের সঙ্কীর্ণমনা শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে দাফতরিক ও জ্ঞানচর্চার কাজকর্মে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষক ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেন, ড. পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, আবুল কাশেম, নুরুল হক ভূঁইয়া, অজিত গুহসহ অনেকে। পরে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে নেতৃত্বে থাকেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। খবর ঢাকায় পৌঁছানোর সাথে সাথে ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এ দেশের ছাত্র-জনতা। মুসলিম লীগ সরকারের এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশের ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
২ মার্চ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের এক বৈঠক হয়। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে। এই বৈঠকেই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ খবর ঢাকায় পৌঁছালে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আর এটিই ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রথম সভা। এরপর ২ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ওই ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ধর্মঘট পালন করেন। ধর্মঘটের পাশাপাশি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রচারপত্র বিলি করে। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গণপরিষদের সদস্যদের জানান দেয়া হয় যে, যত দিন বাংলা ভাষা পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয় তত দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।



