মিয়ানমারের রাখাইনে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল মংডুর মুসলিম নেতাদের সাথে বৈঠক করেছে জান্তা সরকার। বৈঠকে দেশটির সামরিক সরকারের সাথে কাজ করলে মুসলিমদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। এর আগে সান প্রদেশে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করার অভিযোগে তিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে মৃত্যুদণ্ড দেয় মিয়ানমারের সামরিক আদালত। এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন মংডুতে থাকা রোহিঙ্গা কলিম উল্লাহ। এদিকে মংডু এলাকার আরো সাড়ে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় টেকনাফ সীমান্তের ওপারে ওৎ পেতে আছে বলে জানা গেছে।
মংডুর ঠিক উত্তরের দিকে মিয়ানমারে তুমুল যুদ্ধ চলছে। শাহপরীর দ্বীপ থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা না গেলেও টেকনাফে সোমবার রাতে এবং গতকাল মঙ্গলবার সকালেও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান স্থানীয়রা। মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ শহর মাংতাউ সিটির উত্তরে এখন দুই পক্ষের যুদ্ধ চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সিকাংগাই ক্যাম্প বিদ্রোহী আরাকান আর্মি দখলে নিয়েছে এবং সোমবার মিয়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় তিনবার বিমান হামলা করা হয়েছে। পান্নাদ্বীপ এবং ইয়াংহায়ঢেং-এই দুটি জায়গায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে যুদ্ধ চলছে বলে সূত্র জানিয়েছেন। সর্বশেষ নুর উল্লাহ ক্যাম্প ও পান্তাওগাই এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলি হয় আরাকান আর্মির সাথে জান্তা বাহিনীর। মধ্যরাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত এই যুদ্ধের ব্যাপকতায় সীমান্তবাসী চরম আতঙ্কে রয়েছে।

এদিকে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সাথে বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মির চলমান সঙ্ঘাতে ফের বড় ধরনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। দেশটির মংডু এলাকার আরো সাড়ে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ওঁৎ পেতে আছে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে। টেকনাফ এবং নাফ নদী সীমান্তবর্তী নলবুনিয়া, পেরংপুর, নুরুল্লাপাড়া, আজিজের বিল, কাদির বিল, মেগিচং, মাংগালা, ফাদংচা এবং হাসুরাতা অঞ্চলে এসব রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এদের টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে তৎপর সীমান্তবর্তী কয়েক শ দালাল। এ অবস্থায় তাদের প্রতিরোধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে নাফ নদীতে টহল জোরদার করেছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।
গত দুই সপ্তাহে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং উপকূল রক্ষী কোস্টগার্ডের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক চেষ্টা করেও বান্দরবানের তুমব্রু-ঘুমধুম এবং কক্সবাজারের উখিয়ার রহমতের বিল-থাইংখালী, টেকনাফের হোয়াক্যং- খেরাংখালী সীমান্ত দিয়ে কোনো রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫৪ কিলোমিটার বিস্তৃত নাফ নদী এখন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে দালালদের টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব রোহিঙ্গাকে কৌশলে নিয়ে আসার তৎপরতা চালাচ্ছে দালাল চক্র। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি এসব দালাল চক্রকে প্রতিরোধেই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে টেকনাফের কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার এইচ এম লুৎফুল লাহিল মাজিদ বলেন, দালালচক্র যেন সক্রিয় হতে না পারে, সেজন্য আমাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জেলে সমিতির সভাপতিদের ডেকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নূরে আলম মিনা বলেন, এখানে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আছে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের অনেকে মিয়ানমারে রয়েছে। তাদের এ দেশে আনার একটি চেষ্টা অভ্যন্তরে হতে পারে। এ বিষয়টি বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ এবং স্থানীয় সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিনিধি, দালাল কেউ যাতে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে মংডু এলাকায় থেমে থেমে গোলাগুলি অব্যাহত রয়েছে। যার বিকট শব্দ ভেসে আসছে এপারে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে মধ্যে দিন-রাত কাটাচ্ছে। মাঝে মাঝে ওপারের ছোড়া গোলা বাংলাদেশেও এসে পড়ছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ জেটির প্রবেশদ্বারে বাঁশ দিয়ে দেয়া হয়েছে ব্যারিকেড। কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না জেটিতে। সতর্ক অবস্থানে টহল দিচ্ছে বিজিবি। শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ বলেন, শনিবার পাঁচজন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটে। শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, থেমে থেমে মিয়ানমারে গোলাগুলি ও গোলা নিক্ষেপ হচ্ছে। যার কারণে আতঙ্কে নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রয়েছে।
নাফ নদীতে নোঙর করা শত শত ট্রলার। কেউ যেতে পারছেন না মাছ শিকারে। অনেকের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। জেলে আব্দুর রহমান বলেন, নাফ নদীতে এক হাজারের বেশি ট্রলার রয়েছে। এসব ট্রলারে মাছ শিকার করে ৫ হাজার জেলে। কিন্তু এখন এর মধ্যে অনেকে বেকার।

অস্ত্রসহ আসা রোহিঙ্গারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে : মিয়ানমারে সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশে অস্ত্রসহ প্রবেশকারী রোহিঙ্গার মধ্যে ১১জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে অপর ১১ জনকে তিনদিনের রিমান্ডে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। গত সোমবার তিন দিনের রিমান্ড শেষে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গ্যার আদালতে তাদের হাজির করা হয়। এ সময় বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উখিয়ার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নাছির উদ্দিন মজুমদার। তিনি বলেন, প্রথম দফায় নিয়ে যাওয়া ১১ রোহিঙ্গা তিনদিনের রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় অপর ১১ রোহিঙ্গাকে সোমবার দুপুরে কারাগার থেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একই সাথে প্রথম দফায় ১১ জনের দেয়া তথ্যের সাথে যাচাই-বাছাই করা হবে। এর আগে প্রথম দফায় ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে এই ১১ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।
৬ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সংঘাতের মধ্যে পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যের পাশাপাশি অস্ত্রধারী ২৩ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছিলেন। ৯ ফেব্রুয়ারি বিজিবির ৩৪ ব্যাটালিয়নের পালংখালী বিওপির নায়েব সুবেদার মো: শহিদুল ইসলাম বাদি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করে।