মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্রগোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) দখল করা বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) চৌকি ও ক্যাম্পসহ গ্রামগুলো পুনরুদ্ধার করতে রাখাইনে দফায় দফায় বোমা হামলা, মর্টার শেল ও বিমান থেকে গুলি চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। মাঝে মধ্যে সীমান্তের ওপারে দেশটির সেনাবাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টারও উড়তে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার দিনগত সারা রাত গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এতে সীমান্তের এপারে বসবাসরত লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল। গত বুধবার সীমান্তের ওপারে বিমান ও হেলিকপ্টার উড়তে দেখেন স্থানীয়রা। এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে ও রাতে উখিয়া- টেকনাফ সীমান্তের ওপার থেকে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে আসে। রাতে বিরতির পর সকালে সীমান্তের এপার থেকে আবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ফলে সীমান্তের কাছে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না।

স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্য রাত থেকে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংসতার ঘটনায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির সঙ্ঘাত চলছে। এতে টেকনাফের হোয়াইক্যং উত্তরপাড়া, লম্বাবিল, উনচিপ্রাং, কাঞ্জরপাড়া, হ্নীলা মৌলভিপাড়া, ওয়াব্রাং, ফুলের ডেইল, চৌধুরীপাড়া, জালিয়াপাড়া এলাকায় সীমান্তের ওপার থেকে থেমে থেমে গুলি ও মর্টার শেলের শব্দ শোনা গেছে। হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তের ওপারের মিয়ানমারের কুমিরহালি, নাইচদং, কোয়াংচিগং, শিলখালী, নাফপুরা গ্রামগুলোতে যুদ্ধ চলছে। উনচিপ্রাং এলাকার বাসিন্দা মানিক বলেন, কয়েক দিন ধরে তেমন গুলির শব্দ শোনা যায়নি। গতকাল রাত ১২টার পর থেকে ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে চিংড়িচাষিরা নিরাপদ স্থানে চলে আসেন। মূলত আরাকান আর্মির হাতে দখল হওয়া ঘাঁটিগুলো উদ্ধার করতে জান্তাবাহিনী আবারো আক্রমণ করছে। আমরা হেলিকপ্টার ও বিমান দেখতে পেয়েছি। হ্নীলা এলাকার তারেক মাহমুদ রনি বলেন, রাতভর গোলাগুলি হয়েছে। সীমান্তের মানুষের জন্য এটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমাদের ঘুম ভাঙে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলাগুলির শব্দে। সেখানে তুমুল যুদ্ধ চলছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমির নুর আহমদ আনোয়ারি বলেন, কয়েক দিন সীমান্তের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও আবার ভারী অস্ত্রের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সীমান্তের কাছাকাছি বাসিন্দাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। হোয়াইক্যং থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত নাফ নদে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা টহল বৃদ্ধি করেছেন।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী বলেন, হ্নীলা সীমান্তের ওপারে রাখাইন থেকে দফায় দফায় ছোড়া গোলা ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণের শব্দে এপারের সীমান্তে থাকা বাড়িঘর কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছিল গোলাগুলি আমার বাসার পাশেই হচ্ছে। সীমান্তের বাসিন্দারা অনেক আতঙ্কে আছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়েছি, আরাকান আর্মির দখল করা বিজিপির চৌকি-ক্যাম্প ও গ্রামসহ মংডুর রাচিডং-বুচিডং টাউনশিপসহ রাখাইনের আশপাশ এলাকা পুনরুদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধ করছে দেশটির সেনাবাহিনী। এর ফলে এপারের সীমান্তবাসীদের সাগরে ও চিংড়ি-কাঁকড়ার ঘেরসহ ফসলি জমিতে যেতে ভয় পাচ্ছে।
উখিয়া পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পালংখালী-থাইংখালী সীমান্তে থেমে থেমে ভেসে আসছে বিস্ফোরণের শব্দ। তবে আগের তুলনায় কম। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে যেকোনো মুহূর্তে ওপার থেকে গোলা এসে পড়তে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আদনান চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে চলা সঙ্ঘাতের কারণে এপারের টেকনাফ সীমান্তের কাছে বসবাসরতদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনো রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে সেজন্য সীমান্তে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।