মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অমিয় বারতা নিয়ে আগমন করল মাহে রমজানুল মুবারক। আজ ১৪৪৫ হিজরি সনের পয়লা রমজান। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে- হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হলো, যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগে যারা ছিল তাদের ওপর- এই আশায় যে, তোমরা মুত্তাকি হবে। নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন। আর যে কেউ অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে, তার জন্য অন্যান্য দিন থেকে এই সংখ্যা (পূরণ করা কর্তব্য। আর যারা এতে অক্ষম হয়, তাদের কর্তব্য ফিদয়া আদায় অর্থাৎ দরিদ্রকে খাবার দেয়া। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো কল্যাণ কাজ করবে, সেটি তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর তোমরা রোযা রাখবে, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩-১৮৪)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যাওয়ার পর দ্বিতীয় বছরে এ আয়াত নাজিল হয়। এর আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম আশুরা এবং আইয়ামে বিজ বা প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন। তবে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে যে এই রোজা তখন ফরজ ছিল কি না। হানাফিরা বলেন, তখন এই ফরজ ছিল।
শাফেয়ীদের মতে রমজানের রোজার আগে কোনো রোজা ফরজ ছিল না। বরং আশুরা ইত্যাদির রোজা প্রথমেও সুন্নত ছিল এখনো সুন্নতই। আবু দাউদ শরিফের একটি বর্ণনা দ্বারা হানাফিদের মাজহাবের সমর্থন হয়। তাতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার রোজা যাদের ছাড় গিয়েছিল, তাদের তা কাজা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কাজা আদায় করতে হয় ফরজ অথবা ওয়াজিবেরই। অবশ্য যেহেতু রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরা ইত্যাদি রোজা ফরজ না হওয়ার ব্যাপারে ইজমা অর্থাৎ সর্ববাদী সম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, সেহেতু এখন কার্যত উপরোক্ত মতপার্থক্যের কোনো প্রতিফলন নেই।
রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদিস রয়েছে। যেমন : তিরমিজি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে- আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম রাতেই শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না, খুলে দেয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন- হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর বহু মানুষকে আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। হাদিসটি ইবনে মাজাহ শরিফেও বর্ণিত আছে। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হজরত সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতেও এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত আছে। তিরমিজি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে আরো বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজা পালন করবে এবং (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) রাতে জেগে থাকবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হয়। আর ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদেরের (ইবাদাতের জন্য) রাতে জেগে থাকে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হয়। হাদিসটি বুখারি, মুসলিম ও ইবনে মাজাহ শরিফেও বর্ণিত আছে। রমজানের নামকরণের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। অনেকে বলেছেন, এটি ‘রময’ শব্দ থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ, ভীষণ তাপ ও প্রচণ্ড গরম। যে বছর এই মাসের রোজা শুরু হয়েছিল, হয়তো সে বছর এই মাসটি এসেছিল প্রচণ্ড গরমের সময়, তাই এর নাম রাখা হয়েছে রমজান। অনেকের বক্তব্য, এর নামকরণের কারণ, এটি গুনাহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়। আবার অনেকে বলেন, রমজান আল্লাহ তাআলার সুমহান নামগুলোর একটি।
‘শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ’ করা অনেক আলেম আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ শয়তান ইত্যাদিকে মুক্ত থাকতেই দেয়া হয় না। এগুলোকে বন্দী করা হয়। আল্লামা ইবনে মুনাওয়্যার, আল্লামা কাজি ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলায়হিমা প্রমুখ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আল্লামা তুরপশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও আরো কয়েকজন মনীষী এটাকে রূপকার্থে গ্রহণ করেছেন এবং এটিকে আল্লাহর বিশেষ রহমত নাজিল হওয়ার ইঙ্গিত সাব্যস্ত করেছেন। তারা হাদিসটির এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, এই মাসে নেক কাজের সওয়ার বেশি লাভ হয়, গুনাহ মাফ করা হয়, অপরাধ ক্ষমা করা হয়, শয়তানগুলোর প্রভাব হ্রাস পায়। আল্লামা কুরতুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ দুটি বক্তব্যের মধ্য থেকে প্রথমটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে এখানে প্রশ্ন হয় যে, শয়তানকে বন্দী করা হলে এ মাসে অনেক মানুষের দ্বারা অপরাধ ও পাপের কাজ কিভাবে সংঘটিত হয়? বর্ণিত অর্থের দাবি তো এই মাসে কোনো ব্যক্তিই কোনো প্রকার গুনাহে লিপ্ত হবে না।
আল্লামা কুরতুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, পাপাচার ও অপরাধের প্ররোচক শুধু শয়তান ও অবাধ্য জিনগুলোই নয়। বরং গুনাহের আরো অনেক প্ররোচক আছে। যেমন কুপ্রবৃত্তির তাড়না, মানবরুপি শয়তানের সংস্পর্শ, বদঅভ্যাস, সহজাত দুর্বৃত্তপনা ইত্যাদি। তাই দুষ্ট জিন ও শয়তানগুলোকে বন্দী করার ফলে গুনাহের উপকরণ ও প্ররোচক তো হ্রাস পায়, তবে সম্পূর্ণ শেষ হতে পারে না। তা ছাড়া যেহেতু এগারো মাস শয়তান মানুষের পিছনে লেগে থাকে, তাই রমজান মুবারক মাসে এগুলো বন্দী হওয়া সত্ত্বেও সংস্পর্শের প্রভাব অবশিষ্ট থেকে যায়, যদিও হ্রাস পায়। যেমন, গরম লোহা আগুন থেকে বের করার পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত উত্তপ্ত থাকে। যদিও এর উষ্ণতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।



