ইসলামের পাঁচ বুনিয়াদি বিধানের অন্যতম সিয়াম পালনের মাস রমজানুল মোবারকের আজ দ্বিতীয় দিবস। নির্দিষ্ট মাসের সাথে সম্পৃক্ত করে এই ইবাদতটি পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে। তাই রমজান মাস শুরুর আগের দিন যেমন সিয়াম পালনের নির্দেশ নেই, তেমনি নেই রমজান শেষ হওয়ার পরের দিনেও। তবে রমজানের আগের দিন সিয়াম পালন নিষিদ্ধ না হলেও রমজানের পরের দিন সিয়াম পালন নিষিদ্ধ। এ দিনটি ঈদ পালনের। এদিনটি পানাহার ইত্যাদির জন্যই রাখা হয়েছে। আর রমজানের আগের দিনটিতে রোজা রাখা নিষিদ্ধ না হলেও এ দিনটিতে রোজা না রাখার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী, ইবনে মাজা প্রমুখ ইমাম একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রমজান মাস আসার একদিন কিংবা দুই দিন পূর্ব থেকে তোমরা (নফল) রোজা পালন করবে না। হ্যাঁ, তবে তোমাদের কারো পূর্ব অভ্যাস অনুযায়ী রোজা পালনের দিন পড়ে গেলে সে ওই দিনের রোজা পালন করতে পারবে। তোমরা রোজা রাখবে চাঁদ দেখে এবং রোজা শেষও করবে চাঁদ দেখেই। (২৯ তারিখে) আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে ৩০ দিন পুরো করবে (চাঁদ দেখতে না পেলে), এরপর ইফতার করবে (রোজা শেষ করবে)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো কয়েকজন সাহাবির বরাতেও এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত আছে। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ আলেমগণের মতে রমজানের মর্যাদার উদ্দেশ্য থাকলে রমজান মাস শুরুর অব্যবহিত পূর্বে রোজা পালন করা মাকরুহ। তবে কোনো নির্ধারিত দিনে যেমন শুক্রবার বা সোমবার কারো রোজা রাখার পূর্ব- অভ্যাস থাকলে এবং রমজানের আগের দিন সেই দিন হলে এদিনে তার রোজা
পালনে কোনো বাধা নেই।

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে আরো একটি হাদিস বর্ণিত
আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা রমজান মাস শুরুর এক দিন বা দুই দিন আগে রোজা পালন করেবে না। হ্যাঁ, তবে যে ব্যক্তি অভ্যাস মতো রোজা পালন করে সে ওই দিনে রোজা পালন করতে পারে। এ হাদিসটিও উদ্ধৃত করেছেন বুখারি, মুসলিম, ইবনে মাজাহ প্রমুখ ইমাম। প্রকৃতপক্ষে শুধু রমজানের সাথেই ফরজ রোজার সম্পর্ক। রমজান শুরুর এক বা দুই দিন আগে থেকে রোজা রাখা আরম্ভ করলে রমজান মাসটিই সন্দেহযুক্ত হয়ে যাবে। তেমনি নফল ও ফরজ রোজার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে শরিয়ত বিকৃত হয়ে যাবে। তাই শাবান মাসের ২৯ তারিখে চাঁদ দেখা না গেলে পরের দিন কেউ রোজা রাখলে তা হবে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রোজা রাখা। এটিই নিষেধ করা হয়েছে শরিয়তে। এ প্রসঙ্গে ইমাম তিরমিজি ও ইমাম ইবনে মাজাহ একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। তাবেয়ী হজরত সিলা ইবনে যুফার (রহ:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকটে আমরা উপস্থিত ছিলাম। একটি ভুনা ছাগল (খাবারের উদ্দেশ্যে) নিয়ে আসা হলে তিনি বললেন, তোমরা খাও। কিন্তু এক ব্যক্তি দূরে সরে গিয়ে বলল, আমি রোজাদার। হজরত আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন বললেন, সন্দেহের দিনে যে ব্যক্তি রোজা পালন করে সে আবুল কাসেম ( আল্লাহর রাসূলের উপনাম) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যাচরণ করে। ইমাম তিরমিজি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা ও হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতেও হাদিস বর্ণিত আছে। এসব হাদিস অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষজ্ঞ সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্যে সুফিয়ান ছাওরি, মালেক ইবনে আনাস, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, শাফেয়ি, আহমদ, ইসহাক প্রমুখ ইমাম সন্দেহের দিনে রোজা পালন মাকরুহ বলেছেন। এমনকি উক্ত দিনে কেউ রোজা পালন করলে আর দিনটি ঘটনাক্রমে রমজানের দিন হলেও সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রোজা রাখার কারণে একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন এটি রমজানের রোজা বলে গণ্য হবে না এবং সেই ব্যক্তিকে এই দিনের পরিবর্তে একটি কাজা রোজা পালন করতে হবে।

অর্থাৎ সন্দেহের দিন বা ৩০ শাবান যদি কেউ এই মনে করে রোজা রাখে যে, হতে পারে এটা রমজানের দিন; কিন্তু আমরা চাঁদ দেখিনি, তাহলে এই নিয়তে রোজা রাখা ফিকাহর ইমামগণের সর্বসম্মতিক্রমে মাকরূহে তাহরিমি। তারপর যদি কেউ কোনো বিশেষ দিনে নফল রোজা রাখায় অভ্যস্ত হয় আর সে দিনটি ঘটনাক্রমে সংশয়ের দিন হয় তবে তার জন্য নফলের নিয়তে রোজা রাখা সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ। আর যদি অভ্যাস ব্যতীত কোনো ব্যক্তি এই সন্দেহের দিনে নফলের নিয়তে রোজা রাখতে চায় তবে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের মতে এটি সব ধরনের মানুষের জন্যই নাজায়েজ। কিন্তু হানাফিদের মতে সাধারণ মুসলমানদের জন্য নিষেধ, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য অনুমোদিত। তিন ইমাম তো হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিস দলিল হিসেবে পেশ করেন। কেননা এতে নিঃশর্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সাধারণ- বিশেষের কোনো পার্থক্য করা হয়নি। হানাফিদের বক্তব্য হলো- এই নিষেধাজ্ঞার কারণ রমজানের সন্দেহ। এ কারণেই যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই কোনো বিশেষ দিনে রোজা রাখায় অভ্যন্ত আর সে দিনটি সন্দেহের দিনে এসে যায়, তার জন্য উক্ত হাদিসে রোজা রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কেননা, সেখানে রমজানের সন্দেহের কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণকেও শামিল করা যায়। তারা নিজ ইলম ও ফিকাহের ভিত্তিতে সন্দেহ সংশয় ও অস্পষ্টতায় পড়বেন না। বরং নিছক নফল নিয়তে রোজা রাখবেন। অবশ্য সাধারণ মানুষেরা যেহেতু মন থেকে সন্দেহ দূর করতে সক্ষম হয় না, তাই তাদের রোজা রাখতে নিষেধ করতে হবে।