আজ মাহে রমজানুল মোবারকের তৃতীয় দিবস। রমজান মাস সন্দেহমুক্ত রাখার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। রমজান শুরুর আগের দিন সন্দেহ পোষণের সাথে রোজা রাখতে নিষেধ করার তাৎপর্য এটাই। রমজান মাস যেন সন্দেহমুক্ত থাকে, এজন্য রমজানের আগের মাস শাবানের তারিখগুলো হিসাব রাখার নির্দেশনা এসেছে। তিরমিজি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা রমজানের স্বার্থে শাবানের চাঁদেরও হিসাব রাখবে।

রমজান মাসকে সন্দেহমুক্ত রাখার জন্য শরিয়তের আরেক বিধান চাঁদ দেখে রোজা শুরু করা এবং চাঁদ দেখেই রোজা শেষ করা। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা রমজানের পূর্বে রোজা রাখবে না। তোমরা রমজানের চাঁদ দেখার পর রোজা রাখা আরম্ভ করবে এবং চাঁদ দেখার পর তা ভাঙবে। মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ দিন পূর্ণ করবে। হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজি প্রমুখ উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তিরমিজির বর্ণনা অনুযায়ী এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা, হজরত আবু বকরা ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমের বরাতেও হাদিস বর্ণিত আছে।
এসব হাদিসটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মাস প্রমাণিত হওয়া নির্ভর করে চাঁদ দেখার ওপর, এটির অস্তিত্বের ওপর নয়। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, শুধু হিসাবের মাধ্যমে চাঁদ দিগন্তে থাকা বা না থাকার সিদ্ধান্ত দিয়ে মাস প্রমাণিত হতে পারে না। আরো স্পষ্ট দলিল হলো, এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে- মেঘ ইত্যাদি যদি প্রতিবন্ধক হওয়ার কারণে চাঁদ দেখা না যায় তাহলে ৩০ দিন পূর্ণ করা জরুরি।

প্রথম তারিখের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার ওপর হিসাবের ওপর শরিয়ত এজন্য নির্ভর করেনি যে, যদি এমন করা হতো তাহলে এর দ্বারা শুধু শিক্ষিত ও উন্নত অঞ্চলগুলোই আমল করতে পারত। পল্লী ও অনুন্নত এলাকায় যারা থাকে তারা আমল করতে পারত না। অথচ শরিয়ত সবার জন্য প্রযোজ্য। তাছাড়া হিসাবের পদ্ধতি যতই উন্নত হোক তা সত্ত্বেও তাতে ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা সর্বাবস্থায় বিদ্যমান। কারণ গাণিতিক হিসাবের মৌলিক সূত্রমালা সাধারণত নির্ভুুল ও সর্বজন স্বীকৃত হয়। তবে যখন এই মৌলিক সূত্রমালার সাথে শাখা প্রশাখার সংযোগ হয় তখন এতে অনেক সময় ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়। যেমন, এটাতো অকাট্য যে, দুয়ে দুয়ে চার হয়। এ জন্য গণিতের প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী আবু রায়হান আল-বেরুনি নিজ গ্রন্থ ‘আল-আছারুল বাকিয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, প্রথম তারিখের চাঁদ সম্পর্কে অকাট্য হিসাব করা সম্ভব নয়। সুতরাং শরিয়ত এই হিসাবের জটিলতার ওপর এসব আহকামের ভিত্তি স্থাপনের পরিবর্তে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি রেখেছে। সব ধরনের মানুষের জন্য যা সর্বদা ও সর্বত্র প্রযোজ্য হতে পারে।

মোটকথা চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রমজানের শুরু ও শেষ সাব্যস্ত করতে হবে। আরো কারণ এই যে, চান্দ্র মাস কখনো ৩০ দিনে আবার কখনো ২৯ দিনে হয়। এ প্রসঙ্গে ইবনে মাজা শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমরা যতবার ৩০ দিন রোজা পালন করেছি, এর চেয়ে বেশি ২৯ দিন রোজা পালন করেছি। তাছাড়া হজরত ওমর, হজরত আবু হুরায়রা, উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা, হজরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, হজরত আনাস, হজরত জাবির, হজরত উম্মু সালামা ও হজরত আবু বকরা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের বরাতেও এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ২৯ দিনেও মাস পূর্ণ হয় ।

বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি হাদিস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আমরা উম্মি (নিরক্ষর) জাতি। হিসাব-কিতাব জানি না, কোন মাস এত, এত, এত (অর্থাৎ- কোন মাস এভাবে বা এভাবে এভাবে হয়।) তিনি তৃতীয়বারে বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ করলেন। তারপর বললেন, মাস এত দিনে, এত দিনে এবং এত দিনে অর্থাৎ- পুরা ৩০ দিনে হয়। অর্থাৎ- কখনো মাস ২৯ আবার কখনো ৩০ দিনে হয়।