মিয়ানমারে বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে দেশটির জান্তা বাহিনীর তুমুল লড়াই চলছে। রাখাইন রাজ্যে সঙ্ঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়ায় একের পর এক সীমান্তরক্ষীর এপারে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। তাতে উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশেও। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধ চলছে কয়েক মাস ধরে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দখলে থাকা অনেক শহর ও ঘাঁটি বিদ্রোহীরা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের বেশ কয়েকটি ব্যাটালিয়ন দখলে নিয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। ফলে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন সরকারি বাহিনীর সদস্যরা।
এ দিকে মিয়ানমার সেনাদের পাল্টা তাড়া খেয়ে যদি আরাকান আর্মিও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে তাহলে সেটি সঙ্কটের ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। সীমান্তের এত কাছে যখন সঙ্ঘাত চলে তখন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে সীমান্তে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। রাখাইনের মংডু জেলা শহর থেকে টহলে বের হওয়া দুই শতাধিক জান্তা বাহিনীর সদস্যের ওপর আরাকান আর্মির কমান্ডো হামলার পর তারা পালিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। পালিয়ে আসা ১৭৯ বিজিপি সদস্যকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে ১১-বিজিবির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। গত সোমবার বিকেল থেকে তাদের মানবিক কারণে সবধরনের সেবা দেয়া হচ্ছে। এই বিদ্যালয়ে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের অবস্থানের কারণে মঙ্গলবার স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এ দিকে সোমবার বিকেলে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত ইউপি সদস্য সাবের হোসেনের কোমরের পেছনের অংশ থেকে একটি বুলেট বের করা হয়েছে। ওই দিন গভীর রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডাক্তার শাহ আলম এ বুলেট বের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ভুক্তভোগী নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের মেম্বার সাবের হোসেন। তিনি বলেন, বুলেটটি বের করার পর তার প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছে। অপারেশন পেছনে হওয়ায় কষ্ট বেড়েছে তার। এ ছাড়াও অর্থসঙ্কটে ওষুধ কিনতেও পারছেন না তিনি। স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমারের গুলিতে বাংলাদেশ সীমান্তের এপারের বাসিন্দারা গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহত হলেও তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি কেউ। জামছড়ি সীমান্তের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, মঙ্গলবার সকালেও ওপারের রানী এলাকায় গোলাগুলির ব্যাপক শব্দ জামছড়ি ও আশারতলী গ্রামে শুনতে পেয়েছেন। তারা কাঠ কাটতে যাওয়ার পথে সকাল ৭টার দিকে এ শব্দ শোনেন। পরে তারা ভয়ে বাড়ি ফিরে যান।
এ দিকে পালিয়ে আসা মিয়ানমার জান্তার সদস্যদের একজন টুয়ো মং (৪২) জানান, ১০ মার্চ বিকেলে তারা দুই শতাধিক সেনাসদস্য বিদ্রোহী দমনে টহলে বের হন। তারা বলিবাজার জান্তা বাহিনীর তাদের সতীর্থ সেনা ব্যাটালিয়নে ১১ মার্চ রাত যাপন করার কথা ছিল; কিন্তু পথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির যোদ্ধারা অতর্কিত তাদের টহল দলের ওপর হামলা শুরু করলে তারা পাল্টা হামলা করে। রানী ও অংচাপ্রে নামক স্থানের দক্ষিণ-পশ্চিমে ২০ কিলোমিটার গহিন বনে এ ঘটনা ঘটায় তারা কঠিন সমস্যায় পড়েন। পরে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করলে উপরের নির্দেশে তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। ২০০ সদস্যের মধ্যে ১৭৯ জন সীমানা পার হলেও বাকি ২১ সদস্য এখনো বাংলাদেশ সীমানা ঘেঁষে লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন তিনি। তারা যেকোনো সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন। এ দিকে আশ্রয় নেয়া স্কুলের বেঞ্চ সরিয়ে জান্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিছানা সাজানো হয়। অসুস্থদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। গত সোমবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জান্তা সরকারের মোট ১৭৯ জন সদস্য নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের আশারতলী গ্রামের জারুলিয়াছড়ির আগা ও জামছড়ি সীমান্ত দিয়ে তিন দফায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে তাদেরকে নিরস্ত্রীকরণ করে সোমবার দুপুরের পরপর ২৯ জনকে এবং রাতে ১৫০ জনকে নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবি ক্যাম্প-সংলগ্ন বিজিবি স্কুলে নিয়ে আসা হয়। যাদের মধ্যে আহত চারজনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্যকেও খাদ্যসহ মানবিক সহায়তা দিচ্ছে প্রশাসন ও বিজিবি।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোজাহিদ উদ্দিন জানান, ১৭৯ মিয়ানমারের জান্তা সদস্যদের নাইক্ষ্যংছড়ি বর্ডার গার্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে। তাদের বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত মোতাবেক কার্যক্রম চালানো হবে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ত্রিরতণ চাকমা বলেন, ১১ বিজিবি অধিনায়কের প্রস্তাবেই তাদেরকে বর্ডার গার্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার সেই কারণে স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বুধবার থেকে যে ক’দিন ওরা থাকবে এ পর্যন্ত হয়তো এভাবেই থাকবে। আগামী ১০ রমজানের পর রমজান উপলক্ষে স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যসহ (বিজিপি) ৩৩০ জন। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি উখিয়ার ইনানী নৌ-বাহিনীর জেটিঘাট দিয়ে তাদের মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছিল। এরপর ১১ মার্চ বাংলাদেশে পালিয়ে এলো আরো ১৭৯ জন।



