বরগুনার বেতাগীতে ঠিকাদারের গাফিলতিতে চার বছরেও শেষ হয়নি উপজেলার করুনা বালিকা দাখিল মাদরাসা একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ। এতে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কক্ষসঙ্কটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ভবন নির্মাণের উপকরণসামগ্রী মাদরাসার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করতে পারছে না। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনারও আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাদরাসায় একটি চারতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ভবনটি নির্মাণের জন্য ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর গলাচিপার মেসার্স সিয়াম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ দেয়া হয়। দেড় বছর মেয়াদি ওই প্রকল্পের কাজ সাড়ে চার বছরে অর্ধেক শেষ হয়েছে।

সরেজমিনে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভবন নির্মাণের সময় মাদরাসা পুরোনো টিনশেড ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অন্য কোনোস্থানে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলার চলছে পাঠদান। বিষয়টি জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরকে জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, ঠিকাদারের সাথে একাধিকবার চেষ্টা করেও ভবনের কাজ শেষ করা যাচ্ছিল না। পরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এরপর ভবনের কাজ কিছুটা চললেও পরবর্তী সময়ে আর তেমন অগ্রগতি নেই। তিন মাস ধরে কাজ বন্ধ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, কাজ শেষ করা তো দূরের কথা বরং ঠিকাদারের নির্দেশে তার লোকজন একাধিকবার রাতের আঁধারে ভবনের কাজে ব্যবহৃত মালামাল নেয়ার চেষ্টা করে। পরে তাদের বাধার কারণে নিতে পারেনি।

এ ছাড়া অভিযোগ পাওয়া গেছে কাজের অনিয়মেরও। ভবনের নির্মাণকাজ শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। কংক্রিটের ঢালাই দেওয়ার পর পাটের বস্তা বা কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে ভেজানোর কথা থাকলেও তা করেননি ঠিকাদার। শুধু তা-ই নয় মাদরাসা নেয়া বিদ্যুৎ ভবন নির্মাণের কাজে ব্যবহার করে এলেও ঠিকাদার বিল পরিশোধ করেননি। ফলে গত জানুয়ারি মাসে বিদ্যুতের সংযোগ কেটে দেয় পল্লীবিদ্যুৎ বিভাগ। এতে আরেক ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার বলে, ‘চার বছরেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় গাদাগাদি করে ক্লাস করেছি। শ্রেণিকক্ষে জানালা, দরজা ও ফ্যান নেই। অনেক সমস্যা হচ্ছে। তাই দ্রুত ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।’

মাদরাসা সুপার মুহাম্মদ আমীনুল ইসলাম বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ভবন নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য বারবার অনুরোধ করছি। বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীসহ শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তাদের সাথেও কয়েক দফা আলোচনা করেছি। কিন্তু কোনো ফল পাচ্ছি না।’
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, ‘শুরু থেকেই ঠিকাদার বিরতি দিয়ে দিয়ে কাজ করছেন। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে ভবন নির্মাণকাজে দেরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কষ্ট দেখে একাধিকবার নির্মাণকাজ শেষ করার অনুরোধ করেছি, তাতেও সুফল পাওয়া যায়নি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রেনু ভবন নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পারিবারিক সমস্যা, উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও বরাদ্দ সঙ্কটে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। তবে তাড়াতাড়ি নির্মাণকাজ শেষ করা হবে।’

মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমদ বলেন, ‘বিষয়টি জেলার মাসিক সমন্বয় সভায় উত্থাপন করেছি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ও ঠিকাদারের সাথেও কথা বলেছি। তারা দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’
জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে ফান্ডে টাকার সঙ্কট ও করোনা মহামারীর কারণে কাজের ধীরগতি হয়েছে। একাধিকবার দ্রুত কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে ঠিকাদার গাফিলতি করলে কার্যাদেশ বাতিল করা হবে।’