আজ মাহে রমজানের ষষ্ঠ দিবস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের সিয়াম পালনকে ইসলামের পাঁচ বুনিয়াদের অন্যতম বলে সাব্যস্ত করেছেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর- এ মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই ও মুহাম্মাদ সা: আল্লাহর রাসূল, সালাত আদায় করা, জাকাত দেয়া, হজ করা ও রমজান মাসে সিয়াম পালন করা।
তিরমিজি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, রমজানের প্রথম রাত এলে শয়তান ও অবাধ্য জিনদের শিকলবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর কোনো দরজা আর খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। এর পর কোনো দরজা আর বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করেন, হে কল্যাণপ্রার্থী, তুমি এগিয়ে এসো। আর হে অকল্যাণ প্রত্যাশী, তুমি নিবৃত্ত হও। আল্লাহ অনেককে মুক্তি দেবেন। প্রতিটি রাতে এভাবে ঘোষণা চলতে থাকে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ: তার মুসনাদে হজরত আবু হুরায়রা রাজি: থেকে একটি হাদিস সঙ্কলন করেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতকে রমজানে এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, যা আগের কোনো উম্মতকে দান করা হয়নি। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয়; তারা ইফতার না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন; আল্লাহ প্রতিদিন জান্নাত সাজাতে থাকেন এবং বলেন, আমার নেককার বান্দাদের শ্রম ও কষ্ট অচিরেই দূর করা হবে এবং তারা তোমাতে চলে আসবে; অবাধ্য শয়তানদের শিকলবদ্ধ করা হয়, ফলে তারা অন্য সময়ে যেমনটি তাদের কাছে যেতে পারত, এ সময়ে তেমনটি পারে না; শেষ দিনের রাতে তাদেরকে ক্ষমা করা হয়; প্রশ্ন করা হলো- হে আল্লাহর রাসূল এটা কি কদরের রাত? তিনি বললেন, না। বরং কর্মী যখন তার কাজ সম্পন্ন করে, তখন তার পারিশ্রমিক পুরো দিয়ে দিতে হয়।
নেক কাজে উদ্যোগী হওয়া ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা সব সময়ই জরুরি। কিন্তু এ মাসে তাতে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কেননা আল্লাহর অপার রহমত নাজিল হওয়ার মাসে নেক কাজ সম্পাদন ও অন্যায় কাজ বর্জনের মাধ্যমে নিজেকে ভাগ্যবানদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে তাকওয়া অর্জনের যে উদ্দেশ্য সিয়াম পালনের মধ্যে নিহিত, তা সফল হতে হলে রমজানের শুরু থেকেই সযতেœ চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। রমজানের প্রথম রাতে আহ্বানের তাৎপর্য এখানেই নিহিত।
রমজানে যেসব আমলের প্রতি যতœবান হওয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে তারাবিহ আদায়, তাহাজ্জুদ নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাওবা ও ইস্তেগফার করা, দান-সদকা, রোজাদারদের ইফতার করানো, তাসবিহ ও জিকির, শেষ দশকে ইতিকাফ, মাস শেষে সদকাতুল ফিতর ইত্যাদি। রমজানে কিয়ামুল লাইল করার কথা আছে। কিয়ামুল লাইল শব্দের অর্থ রাতের নামাজ। তারাবির নামাজ যেমন কিয়ামুল লাইলের মধ্যে পড়ে, তেমনি শেষ রাতে তাহাজ্জুদও সালাতুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। সালাতুত তারাবি পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। তারাবি পড়ার সময় তার হক আদায় করতে হবে।, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমজানে কিয়ামু রমাদান আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।
রমজানের সাথে কুরআন মাজিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এ মাসেই নাজিল হয়েছে কুরআন মাজিদ। তাই এ মাসে যথাসাধ্য বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক। মহানবী সা: বলেছেন : ‘রোজা ও কুরআন কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে...। ‘ প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘মহানবী সা: ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজানে তাঁর বদান্যতা আরো বেড়ে যেত।’
এ মাসে সর্বদা বিশেষ করে তাওবা করা প্রয়োজন। এ মাসে তাওবার অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নাম থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়া হয়। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপ ক্ষমা করাতে পারেনি, তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক। ‘হজরত ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘মহানবী সা: রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’
রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের মতো রোজার সাওয়াব পাওয়া যায়। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজা পালনকারীকে (রোজাদারকে) ইফতার করাবে, সে রোজা পালনকারীর অনুরূপ সাওয়াব লাভ করবে। এতে রোজা পালনকারীর সাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না। ‘আল্লাহ তায়ালার জিকির এমন এক মজবুত রজ্জু, যা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করে। তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সুগম করে। মানুষকে উত্তম আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। সরল ও সঠিক পথের ওপর অবিচল রাখে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম ব্যক্তিকে দিবা-রাত্রি গোপনে-প্রকাশ্যে জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-বিকেল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করো। (সূরা আহজাব, আয়াত : ৪১-৪২)



