আজ মাহে রমজানের অষ্টম দিবস। রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ভোররাতে সুবহে সাদিকের আগে যে খাবার গ্রহণ করা হয়, তার নাম সাহরি।‘সাহ্র’ শব্দের অর্থ ভোররাত। এ থেকেই এসেছে সাহরি। বুখারি, মুসলিম ও তিরমিজি শরিফে হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা সাহরি খাবে। কেননা সাহরিতে রয়েছে বরকত বা কল্যাণ। তেমনি মুসলিম শরিফে হজরত আমর ইবনুল আস রা: থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমাদের রোজা ও আহলে কিতাবের রোজার মধ্যে পার্থক্য সাহরি খাওয়া। তা ছাড়া আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত আছে, হজরত ইরবাজ ইবনে সারিয়া রা: বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানে আমাকে সাহরি খেতে আহ্বান জানিয়ে বললেন, বরকতপূর্ণ খাবারে এসো। এসব হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, সাহরি খাওয়া মুস্তাহাব বা শরিয়তের পছন্দনীয় একটি কাজ। আল্লাহর রাসূল সা: সাহরি হিসেবে খেজুরের প্রশংসা করেছেন। আবু দাউদ শরিফে হজরত আবু হুরায়রা র: থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, মুমিনের উত্তম সাহরি খেজুর। দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস হজরত মাওলানা মুফতি সা‘ঈদ আহমদ পালনপুরী রহ: বলেন, তবে সাহরিতে পেট ভরে খাওয়া জরুরি নয়। তিনি বলেন, মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি এক লুকমা আহার করল, সে সাহরি খেল। তেমনি মুসনাদে সা‘ঈদ ইবনে মানসুরে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি এক ঢোক পানীয় পান করল, সে সাহরি খেল।
বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’তে গ্রন্থকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ: সাহরির ৯টি বরকত বা সুফল উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সাহরি গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন দিক দিয়ে বরকত হয়। যথা- সুন্নাহ অনুসরণ, আহ্লে কিতাবের বিরোধিতা, ইবাদতের শক্তি সঞ্চয়, ইবাদতে আগ্রহবৃদ্ধি, ক্ষুধার কারণে সৃষ্ট স্খলনের আশঙ্কা দূর হওয়া, আহারের সময় আগত ভিক্ষুককে দান করা কিংবা খাবারে শরিক করার সুযোগ, জিকিরের সুযোগ, কবুল হওয়ার একটি সম্ভাবনাময় সময়ে দোয়া করার সুযোগ ও ঘুমানোর আগে উদাসীন থাকলে এ সময়ে রোজার নিয়ত করার সুযোগ। তেমনি তাকিউদ্দিন ইবনে দাকীকুল ঈদ বলেন, সাহরির এই বরকত প্রতিফলিত হতে পারে আখেরাতে। কেননা সুন্নাহ পালনের ফলে প্রতিদান নিশ্চিত হয় এবং তা বাড়ে। আবার এ বরকত পার্থিব জীবনেও প্রতিফলিত হতে পারে। যেমন শরীরে রোজা রাখার শক্তি সঞ্চারিত হয়। অথচ রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।
সাহরি গ্রহণের শেষ সময় সুবহে সাদিক বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে কুরআন মাজিদে। সুতরাং সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর ক্ষণিকের জন্যও পানাহারের অনুমতি থাকতে পারে না। হজরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ: তাফসিরে মা‘আরেফুল কুরআনে এ প্রসঙ্গে একটি মাসআলা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সময় সম্পর্কে যাদের সঠিক জ্ঞান আছে, আকাশ পরিষ্কার থাকলে তাদের পক্ষেই নিজের চোখে ‘কৃষ্ণঊষা থেকে শুভ্রঊষা স্পষ্ট হয়ে যাওয়া’ দেখে সাহরির সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারবেন তারা। কিন্তু যাদের এ সুযোগ নেই অর্থাৎ আকাশ ঠিকমতো দেখার সুযোগ নেই, সুবহে সাদিক বা সময় সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞানও নেই, তেমনি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে তাদের জন্য অন্যান্য লক্ষণ কিংবা জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্য নিয়ে সাহরি-ইফতারের সময় নির্ধারণ করতে হবে। অবশ্য এসব হিসাবের মধ্যেও এমন সময় আসতে পারে, যখন সুবহে সাদিক হওয়ার ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায় না। এমন সন্দেহপূর্ণ ক্ষেত্রে কী করা উচিত- এ সম্পর্কে ইমাম জাসসাস তার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বলেন, এরূপ ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে পানাহার না করা উচিত। তবে এমন সন্দেহপূর্ণ সময়ের মধ্যে যদি কেউ পানাহার করে ফেলে, তাহলে সে পাপী হবে না। কিন্তু পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সাব্যস্ত হয় যে, তখন সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছিল, তাহলে সে দিনের রোজাটি কাজা করতে হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে যেহেতু বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সুবহে সাদিক, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ইত্যাদি সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়, সুতরাং এ যুগে ‘সন্দেহের সুযোগ’ নেয়ার অবকাশ নেই।