আজ মাহে রমজানুল মোবারকের নবম দিবস। বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরায়রাহ্ (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ‘রোজাদারের জন্য দু’টি খুশি রয়েছে। একটি ইফতার করার সময়, অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও বেশি পবিত্র ও পছন্দনীয়’।
বস্তুত সিয়াম পালনের মাধ্যমে রাব্বুল আলামিনের প্রতি দাসত্ব ও আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে মুমিন বান্দারা। এজন্যই আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং পার্থিব বিচারে যা ঘৃণার বিষয়, তা তাদের দাসত্বের প্রকাশ হিসেবে আল্লাহর কাছে প্রিয় বলে গণ্য হয়।

ঈমানদার মানুষরা প্রতিটি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিজেদের দাসত্ব প্রকাশ করে। এজন্যই ইবাদতে শরিয়তের সীমারেখা অনুসরণ করা অপরিহার্য। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সিয়াম পালনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- ‘অতঃপর তোমরা সিয়াম পূর্ণ করবে রাত পর্যন্ত’। আয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘লায়ল’ শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘রাত’। এ থেকে ধারণা হতে পারে, সূর্যাস্ত হলেই নয়, সন্ধ্যাকাল অতিক্রম করলেই সিয়াম পূর্ণতা পায় এবং তখন ইফতার করতে হয়। কিন্তু আরবি অভিধান অনুযায়ী ‘লায়ল’ বলতে বোঝানো হয় সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়কে। তেমনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তব জীবনাচারের মাধ্যমে উম্মতের কাছে স্পষ্ট করে গিয়েছেন যে, সিয়ামের সীমা সূর্যাস্ত। তাই সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা শরিয়তের বিধান। এ ব্যাপারে সন্দেহ বা দ্বিমতের অবকাশ নেই। এ প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদিস রয়েছে। হজরত সাহল (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যতদিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে। (বুখারি, মুসলিম)। হজরত ‘ওমর (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যখন ওদিক থেকে রাত (পূর্বদিক হতে রাতের কালো রেখা) নেমে আসে, আর এদিক থেকে (পশ্চিম দিকে) দিন চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখনই রোজাদার ইফতার করে। (বুখারি, মুসলিম)।

হজরত আবু হুরায়রাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার কাছে সেই বান্দা বেশি প্রিয় যে (সময় হয়ে যাবার সাথে সাথে) ইফতার করতে ব্যস্ত হয়। (তিরমিযি)
হজরত আবু হুরায়রাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : দীন সর্বদাই বিজয়ী থাকবে (ততদিন), যতদিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কারণ ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানরা ইফতার করতে বিলম্ব করে। (আবু দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)

এসব হাদিস থেকে সূর্যাস্তের সাথেই যে রোজার সময় শেষ হয়ে যায়, শুধু তা-ই প্রমাণিত হয় না, সূর্যাস্তের পর ইফতারে বিলম্ব না করাও আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে প্রিয় বলে প্রমাণিত হয়। তবে মামুলি বিলম্ব নিন্দনীয় হবে না। বিশেষ করে যখন সরাসরি সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করা যায় না, বরং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহায়তায় হিসাব করে সূর্যাস্ত নির্ধারণ করা হয়, তখন সাবধানতার জন্য দুই-তিন মিনিট অপেক্ষা করা বরং শ্রেয় হবে।
উল্লেখ্য, পানাহারসহ সব ক্ষেত্রে পরিমিত রক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহর রাসূল সা: এর জীবনে এটাই পরিলক্ষিত হয়। হজরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মাগরিবের) সালাতের আগে কিছু তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না পেতেন, শুকনা খেজুর দিয়ে করতেন। যদি শুকনা খেজুরও না পেতেন, কয়েক চুমুক পানি পান করে নিতেন। (তিরমিযিও আবু দাঊদ)।
ইফতারের সময় পাঠ করার দু’টি দোয়া পাওয়া যায়। যেকোনো একটি পাঠ করলে চলবে। হজরত ইবনু ‘ওমার (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতার করার পর বলতেন, ‘জাহাবাজ জমাউ অবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া ছাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ’। অর্থাৎ পিপাসা চলে গেছে, (শরীরের) শিরাগুলো সতেজ হয়েছে এবং আল্লাহর মর্জি হলে সাওয়াব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। (আবু দাঊদ)
মু‘আয ইবনু যুহরা (র:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতার করার সময় (এ দোয়া) বলতেন : ‘‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া ‘আলা রিজকিকা আফতারতু’’ অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তোমার জন্য রোজা রেখে, তোমার [দান] রিজিক দিয়ে ইফতবার করছি। (আবু দাঊদ)।