মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ঘিরে চলা জান্তা বিরোধী সঙ্ঘাত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এরইমধ্যে প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় পার হয়েছে এই সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি। মিয়ানমারজুড়ে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশটির অন্যান্য প্রতিবেশীর মতো বাংলাদেশও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আরাকান অঞ্চলের একাংশ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। এপারে অবস্থান কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কয়েকটি এলাকা। আরাকান আর্মি ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টার শেল ও গুলির শব্দ আবারো শুনেছেন কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে বসবাসকারীরা। রাখাইন রাজ্যের মংডুর উত্তরে নাকপুরা ও বলিবাজার এলাকায় গত সোমবার মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত থেমে থেমে ২০- ২৫টি মর্টার শেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নাফ নদীর এপারে টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালীসহ কয়েকটি এলাকা কেঁপে ওঠে। এর আগে রোববার রাতে মিয়ানমারের ওই দুই গ্রামে ৩৩ মিনিটে ২১টি মর্টার শেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে।
নিজেদের অস্তিত্ব রায় জান্তা বাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির যোদ্ধাদের চলছে সংঘর্ষ। সংঘর্ষের প্রভাব পড়ছে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে। ২২ মার্চ মিয়ানমারে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হবে। এরপর থেকে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষ আরো তীব্র রূপ নিতে পারে। এ কারণে অনেকটাই আতঙ্কে আছেন সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশীরা। জানা যায়, ক'দিন ধরে মিয়ানমারের নাফপুরা ও বলিবাজারে সশস্ত্র আরাকান আর্মির সদস্যরা অবস্থান নিয়ে সেখানকার সীমান্তরী পুলিশের (বিজিপি) সেক্টর দফতর ও একাধিক সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালাচ্ছে। সরকারি বাহিনীও তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে। টেকনাফ স্থলবন্দরে আসা মিয়ানমারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, পাঁচ-ছয়দিন ধরে আরাকান আর্মি মংডু টাউনশিপের দক্ষিণ-পূর্ব শহর রাচিডংয়ে হামলা বাড়িয়েছে। মংডু থেকে আরাকান রাজ্যের রাজধানী সিথুয়ে (আকিয়াব) যাতায়াতের মধ্যভাগে রাচিডং শহরের অবস্থান। এরইমধ্যে দখল হয়ে যাওয়া বিজিপির ঘাঁটিগুলো পুনরস্কারে চেষ্টা চালাবে জান্তা বাহিনী। তখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য সীমান্তে জড়ো হয়েছে। হীলার বাসিন্দা ইসমাইল বলেন, সোমবার রাতে তারাবির নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঠিক রাত ১২টায় মিয়ানমার থেকে মর্টার শেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। এতে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। এরপর একটু ঘুম এলে মঙ্গলবার ভোরে আবার গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙে। এখন সবাই আতঙ্কে আছি। হীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী জানান, রাত ঠিক ১২টায় মিয়ানমার থেকে মর্টার শেল বিস্ফোরণের এমন বিকট শব্দ ভেসে এলো যাতে আমিও আতঙ্কিত হই।

পরে আমার এলাকার সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা যেন আতঙ্কিত না হয়, সে জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছি। হীলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, তারাবির নামাজ শেষ করে একটা দোকানে বসে আছি। হঠাৎ ওপার থেকে গুলি ও মর্টার শেলের বিকট আওয়াজ আসতে থাকে। টেকনাফ ব্যাটালিয়ন ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ জানান, খারাংখালী সীমান্তের পূর্বে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ সীমান্ত এলাকায় শোনা গেছে বলে শুনেছি। তবে সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা যেন আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদে থাকতে পারে সে জন্য আমাদের বিজিবি টহল কার্যক্রম আগের মতো শক্ত অবস্থায় রয়েছে। টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের অব্যাহত সঙ্ঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সীমান্তে এরইমধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য জড়ো হয়েছে বলে শোনা গেছে। যদিও বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছে,
অবৈধভাবে কোনো রোহিঙ্গাকে আর বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। সীমান্তের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক থেকে চলা সঙ্ঘাতে রাখাইনের উপশহর মংডু, বুচিডং ও রচিডং লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। রাখাইন রাজ্যের রাজধানী ও বন্দর নগরী সিথওয়ের সাথে এই তিন শহরের সরাসরি সড়ক ও নৌপথের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। শহরগুলোয় খাদ্যসামগ্রীসহ জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- এ কারণে দিনের বেলায় সঙ্ঘাত সীমিত রেখে রাতে লড়ছে উভয়পক্ষ। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রম চলে রাখাইনের সিথুয়ে বন্দর ও টেকনাফ স্থলবন্দর হয়ে। ওপারের শক্তিশালী গ্রেনেড ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণে কাঁপছে টেকনাফের নাইকাংপাড়া, চৌধুরীপাড়া, জালিয়াপাড়া, হাঙ্গরডেইল, কুলারপাড়া, আলিয়াবাদসহ বেশ ক'টি গ্রাম। শিগগিরই যে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ হবে, সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন অনুসারে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে
আসা মিয়ানমার সীমান্তরীদের সে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছে। ১১ মার্চ সীমান্তপথে বিজিপির ১৭৯ সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে আশ্রয় নেয়া ৩৩০ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে এসব এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী সহজে সীমান্ত নিরাপত্তা হাতছাড়া করবে না। ফলে সামনের দিনগুলোতে এসব এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালাবে। এর ফলে সঙ্কট দীর্ঘায়িত হবে এবং এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং সীমান্ত এলাকার মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের চলমান সঙ্কট নিবিড়ভাবে পর্যবেণ করার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে
পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। মিয়ানমারের এই সঙ্কটের কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে এবং এর পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তাসহ নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।