সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমে এলো সব ধরনের সবজিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর! একে জাদুকরী কারিশমা বলছেন সাধারণ ক্রেতারা। পাশাপাশি এও বলছেন, সরকার চাইলে সারা বছরই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব এটাই প্রমাণ। এমনকি কালোবাজারিদের নিয়ন্ত্রণও অসম্ভব কিছু নয় বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
কিশোরগঞ্জের নিকলী, বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিটামইনসহ হাওর অঞ্চলের বাজারগুলোতে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম অনেক কমে এসেছে। এতে করে হাওরের সাধারণ জনগণের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। সরকারের তদারকির ঘাটতির বিষয়ে চতুর্মুখী সমালোচনার হয়। পাশাপাশি সোস্যাল মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে আলোচনায় আসায় কঠোর নজরদারি শুরু হলে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এসব বাজারে।
হাওর অঞ্চলের উপজেলাগুলোতে রমজানের শুরুর দিকে অতি লাভের আশায় সব কিছুর দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। মাছ ও সবজিসহ কিছু পণ্য চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে জমা রাখলেও কৌশলে ধরা পড়েছে এসব ব্যবসায়ীরা। বিক্রেতারা বলছেন, মালিকদের কাছে কমে না পাওয়ায় আমরাও কমে দিতে পারছি না। কৃষকদের দাবি, সব কিছুর দাম না কমিয়ে হঠাৎ সবজির দাম কমে যাওয়ায় লসে পড়তে হবে।
চলতি রমজানের প্রথম থেকে হাওরের হাট-বাজার ঘুরে দেখা মিলে ১২০ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। রসুন ২৫০ টাকার স্থলে ৮০ টাকায়। আদা ২৫০-এর পরিবর্তে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়। দুধ ১২০ থেকে ১৫০ টাকার স্থলে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। সয়াবিন তেল লিটারে কমেছে ২০ টাকা, মুড়ি ১০ টাকা এবং গোশতের দামও কিছুটা কমেছে। দাম কমতিতে বেশি প্রভাব পড়েছে সবজিতে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের লাউ জাতীয় সবজিতে কয়েকগুণ কমেছে। এ ছাড়াও শসা ও ক্ষিরার কেজি ৬০ টাকার স্থলে ১৫ টাকা হয়েছে। টমেটো ১০ টাকা, বেগুনের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা। কমেছে কলার দামও। বিভিন্ন প্রকারের মাছের দামও কমেছে কেজিতে ২০ থেকে ১০০ টাকা। ১১০০ টাকা দরের ডিমের দাম বিক্রেতারা জানান তিন দিনের ব্যবধানে ৯০০ টাকায় নেমে এসেছে।

তবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে চাষিদের মাঝে। চাষিদের ভাষ্য, হঠাৎ করে এত বেশি দাম কমে গেলে লসের মুখে পড়তে হবে। দেশে সার, তেল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বীজ, কীটনাশকের দাম বেড়েই চলেছে। এগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হলে সেক্ষেত্রে কম দামে বিক্রি করা হলেও তাদের কোনো সমস্যা তৈরি হতো না।
পাইকারি ও খুচরা অনেক বিক্রেতার ভাষ্য, চাষিদের কাছ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে আসতে পারলে তারাও কম দামে বিক্রি করতে পারবে।
বাজিতপুরে উপজেলার হিলোচিয়া বাজারের ক্রেতা মারবিন, ছাতিরচরের বাজারের শহিদুল ইসলাম, পিরোজপুরের কামরুল ইসলাম, নিকলী সদরের জাকির হোসেন, অষ্টগ্রাম উপজেলার পল্লব মিয়া, ইটনা উপজেলার কাশেম মিয়া ও কটিয়াদী উপজেলার রাজনসহ আশপাশের আরো কয়েকটি উপজেলার ক্রেতাদের সাথে কথা হয়। তারা বলেন, ৩/৪ দিন ধরে বিভিন্ন সবজিসহ নানান প্রকার পন্যের দাম কমে আসায় তাদের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে রোজা পরবর্তীতে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কতটুকু সহায়ক হবে তদারকির দায়িত্বে থাকারা, এমন প্রশ্ন ও তারা করেন।
ছাতিরচরের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ'লীগের সভাপতি শামসুজ্জামান চৌধুরী সত্যতা স্বীকার করে বলেন, রোজার প্রথম থেকে শুরু করে ৫র্থ দিন পর্যন্ত সবকিছুর দাম খুব বেশি ছিল। ৩-৪ দিন ধরে হঠাৎ জিনিস পত্রের দাম বহু অংশে কমে এসেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী পদক্ষেপ বিষয়ে তিনি সরকারকেই বাহবা জানান।

জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি কাঁচামাল বাজার হিসেবে পরিচিত পিরিজপুর বাজারের ইজারাদার মামুন মিয়া জানান, রোজার শুরুর দুই তিনদিন বাজারে সবকিছুর চড়া দাম ছিল সত্য। বর্তমানে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তিনি বলেন, এ বাজারে আজ ১০ টাকা কেজিতে বেগুন বিক্রি হচ্ছে। তরমুজ, আনারসসহ বিভিন্ন ফলের দামও তুলনামূলক অনেকটা কমেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবদানের পাশাপাশি কৃষকের আবেদনের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এই বিষয়ে বলেন, অষ্টগ্রামের ইউএনও, ভোক্তা অধিকারের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থেকে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কার্যকরী ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে চলেছি। যার ফলে স্থানীয় বাজার বর্তমানে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বাজিতপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকতা বলেন, দাম কমানোর বিষয়টি আসলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণীর উপর নির্ভরশীল। তবে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে হঠাৎ দাম বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে আমি সতর্ক অবস্থানে ছিলাম। পাশাপাশি স্থানীয় সবজির দাম কমার বিষয়ে আমাদের নজরদারি যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।
নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া আক্তার বলেন, নিয়মিত আমাদের বাজার মনিটরিং হচ্ছে। এই বিষয়ে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারের সভাপতিসহ একাধিক দায়িত্বে থাকাদের নিয়ে মিটিং করেছি উপজেলাতে। জনগণের সহযোগিতার কারণেই স্থানীয় বাজারের ঊর্র্ধ্বগতির নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেও তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের সাথে মুঠোফোনে দুপুর দেড়টার দিকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।