- অনিশ্চয়তার জালে ১৬০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ
- প্রায় ৭ বছরেও ৪৭টির কাজই শুরু হয়নি

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে বিদায় নেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল সেবা প্রকল্পটি নিজেই অ্যানালগ রোগে আক্রান্ত। অনিশ্চয়তার জালে আটকে আছে উপজেলাপর্যায়ে ১৬০ আইসিটি সেন্টার স্থাপন কার্যক্রম। তিন বছরের প্রকল্প এখন সাত বছর কাটিয়ে দিলো। অগ্রগতি হতাশাজনক। ৮০টির কাজ চলমান থাকলেও ৩৩টির কাজ বন্ধ। আর সাত বছরে কোনো কাজই শুরু হয়নি ৪৭টি বা ২৯.৩৭ শতাংশ সেন্টারের। সঠিক সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প নেয়ায় এখন জমি নির্ধারণ না হওয়া, নতুন করে জমি বরাদ্দ, উপজেলা পরিষদ কর্তৃক কাজ বন্ধ, নকশা চূড়ান্ত না হওয়া, বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) নির্ধারণ না হওয়া, নিচু জমি, নির্মাণকাজ পরিত্যক্ত, টপেগ্রাফিক ও মাস্টার প্ল‍্যানের ঘাটতির কারণে প্রকল্পটি অ্যানালগে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, নির্মাণকাজের জন্য পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট থাকলেও দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, প্রকল্পের বিভিন্ন অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ ছাড়াও প্রকল্পের কাজের শ্লথ গতির অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে ঠিকাদারদের কর্মতৎপরতার ঘাটতি। প্রকল্পের অনুমোদিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রত্যেক উপজেলায় আইসিটি অবকাঠামো গড়ে ওঠে এবং তৃণমূল পর্যায়ের প্রত্যেক নাগরিক ই-গভর্নেন্সের সুযোগ- সুবিধা লাভে দ্বিতীয় ধাপে ১৬০টি উপজেলায় আইসিটি ট্রেনিং ও রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ২০১৭ সালে। অ্যাস্টাবলিশমেন্ট অব ওয়ান হানড্রেড সিক্সটি উপজেলা আইসিটি ট্রেনিং অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন (ইউটিআরসিই)-ফেজ ২ শীর্ষক প্রকল্পটি জুলাই ২০১৭ থেকে তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়নে ৩০ জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত অনুমোদন দেয় একনেক। বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয় ৮৪৫ কোটি ৪২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুই দফায় মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রকভাটির পরের অনুমোদিত ব্যয় ৮৬৮ কোটি ১২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বাস্তবায়নের সরেজমিন তথ্য থেকে জানা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্প এলাকায় জমি বরাদ্দ, সয়েল টেস্ট, ডিজাইন ও কার্যাদেশ সম্পন্ন হলেও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজের গতি খুবই দীর। তিনটি সাইটের কাজ উপজেলা পরিষদ কর্তৃক বন্ধ হয়ে আছে জমির ভাইব্রেশনজনিত সমস্যার কারণে। নতুন করে জমি বরাদ্দের কারণে সাতটি সেন্টারের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এখন পর্যন্ত নকশা চূড়ান্ত হয়নি ছয়টি সেন্টারের। বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) এখনো নির্ধারণ করা হয়নি ১৩টি সেন্টারের। গাছপালা, পরিত্যক্ত দালানসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বন্ধ আছে ১৩টি সেন্টার। তা ছাড়া জমি এখনো নির্ধারণ করা যায়নি পাঁচটি সেন্টারের। যদি এই সমস্যাগুলোর আশু সমাধানের উদ্যোগ না নেয়া হয় তবে প্রকল্পের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। দেখা যায় যে, ৮০টি উপজেলা সেন্টার নানান রকম প্রতিবন্ধকতার। মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে নিচু জমি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে ২৭টি সেন্টারের, নতুন জমিতে স্থানান্তর সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে সাতটি সেন্টারের।

জমি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে পাঁচটি সেন্টারের, নতুনভাবে ডিজাইন করতে হবে হবে একটি সেন্টারের। বিওকিউ অনুমোদনে বিলম্বজনিত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে- ১৮টি সেন্টারের, নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে তিনটি সেন্টারের, টপোগ্রাফিক ও মাস্টার প্ল্যানের ঘাটতি রয়েছে পাঁচটি সেন্টারের। উপজেলা পরিষদ কর্তৃক বালু ভরাট করা হয়েছে একটি সেন্টারের এবং থার্ড পার্টি সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে ১৬.২৫ শতাংশ সেন্টারের। এসব প্রতিবন্ধকতা প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এর মধ্যে ২৫টি সেন্টার অধিক প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ আর পাঁচটি সেন্টার তুলনামূলক কম সমস্যাপূর্ণ। কম সমস্যাপূর্ণ সেন্টারগুলোর বিদ্যমান সমস্যা সমাধানপূর্বক প্রকল্পকাজের গতিকে ত্বরান্বিত করা যায় আর অধিক সমস্যাপূর্ণ প্রকল্পগুলো যদি এই ফেজে সমাধান না করা যায়। তবে পরের ফেজের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু হয়নি ২৯.৩ শতাংশ সেন্টারের, পাইলিং ও ফুটিং পর্যায়ে রয়েছে ৪০ শতাংশ সেন্টারের, একতলার কাজ চলমান ১০ শতাংশ সেন্টারের, দোতলার কাজ চলমান ৭.৫০ শতাংশ সেন্টারের, স্ট্রাকচার সম্পন্ন করার কাজ চলমান ৩.৭০ শতাংশ সেন্টারের এবং ফিনিশিং পর্যায়ে রয়েছে ৯,৩০ শতাংশ সেন্টার। এই চিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ এখনো সন্তোষজনক নয়। ফলে প্রকল্পের অন্যান্য উদ্দেশ্যে অর্জন করা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএ কনসাল্ট ইনটারন্যাশনাল লিমিটেডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৬০টি সেন্টারের মধ্যে মোট ১১৩টি সেন্টারের নির্মাণকাজ শুরু হলেও ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাত্র ৮০টি উপজেলায় বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। বাদ বাকি ৩৩টি সেন্টারের কাজ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে বন্ধ রয়েছে।

চলমান ৮০টি সেন্টারের নির্মাণকাজ নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। অন্য দিকে ১৬০টি সাইটের মধ্যে ৪৭টি সাইটে এখনো কোনো ধরনের কাজ শুরু করা হয়নি। অর্থাৎ ২৯.৩৭ শতাংশ সেন্টারের নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। জানা যায়, প্রকল্পটির শুরু থেকে অদ্যাবধি পাঁচজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ বা বদলিজনিত কারণে প্রকল্প কার্যক্রম বাধার সম্মুখীন হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকরা একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত। মহাপরিচালক, ব্যানবেইস বা যুগ্ম সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের-এর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পটিতে একজন পূর্ণ দায়িত্বপান্ত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হলে তা প্রকল্প কার্যক্রম বাস্তবায়নে বেশি সহায়ক হবে। পরিকল্পনা বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বাজারের জিনিসপত্রের দামের সাথে প্রকল্প বাজেট সমন্বয় করা হয়নি, যা প্রকল্পের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ও জটিলতা প্রকল্পের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আরডিপিপি সম্পন্ন করে তা অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সপ্তা করতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে অর্থ ছাড়েও বিলম্ব হচ্ছে। প্রকল্পকাজের ধীরগতি সুবিধাভোগীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারে। কেননা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষকদের জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষক অধীর আগ্রহ নিয়ে এই সেন্টার নির্মাণের জন্য অপেক্ষা করছেন। কেননা তারা এখান থেকে ট্রেনিংয়ের মাধ্যেমে আইসিটি দক্ষতা অর্জন করতে চান এবং সেই জ্ঞান ও দক্ষতা শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যেমে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে চান। পরিককল্পনা কমিশন বলছে, দেখা যাচ্ছে এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। জমি বরাদ্দ জটিলতা, নিচু জমি, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যেকার সমন্বয়হীনতা, জিনিসপত্রের দাম বর্তমান বাজারের দামের সাথে সমন্বয় না করা, অর্থ ছাড়ের জটিলতা, লোকবলের ঘাটতি ও ঠিকাদারের কর্মতৎপরতার অভাবে প্রকল্পটির শ্লথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আশু উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রকল্পকাজকে বেগবান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাহলে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ লাভের মাধ্যেমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৪-এর গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন।