সুন্দরবনের বনজ ও মৎস্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল জেলে-বাওয়ালীদের সুন্দরবনে ঢোকার টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে চলেছে। ৩১ আগস্ট নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর রোববার থেকে সুন্দরবনে যেতে পারবেন বনজীবীরা। বনে ঢোকার দিন ঘনিয়ে আসায় শুরু হয়েছে নৌকা ও জাল মেরামতের তোড়জোড়। সবকিছু ঠিক থাকলে মাছ ও কাঁকড়া ধরার জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে যেতে পারবেন বনজীবীরা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ, কৈখালী ও রমজাননগর এলাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন চুনা, চুনকুড়ি, মালঞ্চ ও খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে পুরনো নৌকা, ছেঁড়া জাল মেরামত ও রঙ করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন বনজীবীরা। এসব এলাকার প্রায় ১০ হাজার জেলে পরিবার সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলায় চার দিকে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। তাদের মুখে বইছে হাসির ঝিলিক।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার ষাটোর্ধ্ব হানিফ গাজী ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরার পেশায় জড়িত। সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরা নিয়ে তার রয়েছে নানান অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই বাদায় (সুন্দরবনে) মাছ-কাঁকড়া ধরার কাজে জড়িত। এখন পর্যন্ত এ পেশায় আছি। বছরের দু’টি সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। তখন আমাদের অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হয়। মাছ ধরা শুরুর আগে ঋণ করে নৌকা মেরামত ও জাল কিনে নদীতে নামি। তবে মাছ পাওয়ার বিষয়টি অনেক সময় ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। নদীতে নামলে অনেক সময় মাছ পাওয়া যায়, আবার অনেক সময় খালি হাতে ফেরতে হয়।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা, জীবজন্তু ও মাছের প্রজনন বাড়ানোর জন্য ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৯২ দিনের জন্য সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা ও পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রজনন মৌসুম হিসেবে বন্ধ রাখা হয়েছিল কাঁকড়া ধরা। ফলে সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া ধরার ওপর নির্ভরশীল মানুষ চরম কষ্টে ছিল।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে বিএসসি (নোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) হয়েছে ২ হাজার ৯০০টি।

বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এ বি এম হাবিবুর রহমান জানান, সাধারণত একটি নৌকায় দুই-ছয় জন করে মাছ কিংবা কাঁকড়া ধরতে সুন্দরবনে ঢুকে থাকেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবার মাছ ও কাঁকড়া ধরার অনুমতি দেয়া হবে। এতে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে জেলেদের মাঝে।
সুন্দরবন ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম জানান, পর্যটকের ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলে। সুন্দরবনে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পর্যটক ঢোকা বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় তাদের প্রায় এক হাজার ট্রলার চালক ও শ্রমিক বেকার জীবনযাপন করেন। তাদের সংসার চলে খুব কষ্টে ধার-দেনা করে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, তিন মাস পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও বাওয়ালীদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেয়া হবে। এ জন্য আগে থেকে জেলে বাওয়ালীর পাশাপাশি পর্যটক পরিবহনকারী ট্রলার মালিকেরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।