কংক্রিটের এই যান্ত্রিক শহরে বিশুদ্ধ বায়ু নেয়ার স্থান বলধা গার্ডেন। উদ্ভিদ উদ্যানটি অবস্থিত ঢাকার ওয়ারী এলাকায়। এই উদ্যানে প্রচুর দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ৩.৩৮ একর জায়গার ওপর এই উদ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। এ বাগানের মোট ৮০০ প্রজাতির প্রায় ১৮,০০০ উদ্ভিদ আছে।
তদানীন্তন ঢাকা জেলা, বর্তমান গাজীপুর জেলার বলধার জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ১৯০৯ সালে বলধা গার্ডেনের সূচনা করেন। তিনি দু’টি উদ্যান তৈরি করেন। প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন ‘সাইকী’। পরবর্তীতে তৈরি করা হয় দ্বিতীয় উদ্যান ‘সিবিলী’। সাইকী অর্থ আত্মা ও সিবিলী অর্থ প্রকৃতির দেবী। দু’টি শব্দই গ্রিক পৌরাণিক শব্দ। নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর কোনো এক সময়ে এ দুটি উদ্যানকে সম্মিলিতভাবে বলধা গার্ডেন নামে আখ্যায়িত করা হতে থাকে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে এটি ছিল বলধার সেই জমিদারের বাগানবাড়ি, যা তখন ঢাকার উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। নিয়মিত সেখানে বসতো গান বাজনার আসর। ধারণা করা হয় বলধা নাম থেকেই বলধা গার্ডেনের নামকরণ হয়েছে। সাইকী উদ্যানের পেছনেই ছিল জমিদার বাড়িটি। বর্তমানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুরম্য একটি বিলাসবহুল অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট। উদ্যানের কর্মকর্তাদের মতে, জমিদারের রাজবাড়িটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেই অ্যাপার্টমেন্ট করা হয়েছে।
১৯৪৩ সালে নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর মৃত্যুর পর কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণ ট্রাস্টের মাধ্যমে এর তদারকি ও পরিচালনা করা হয়। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকারের আমলে কোর্ট অব ওয়ার্ডস্থ বাগানের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ছিল। কিন্তু তাদের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বাগানের অবস্থার অবনতি হওয়ায় পাকিস্তান সরকার বাগানের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য ১৯৬২ সালে বলধা গার্ডেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বন বিভাগকে। বর্তমানে এটি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এখতিয়ারভুক্ত বাগান।
বলধা গার্ডেনে যেমন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উদ্ভিদ রয়েছে ঠিক তেমনি দেশ বিদেশের খ্যাতিমান লোকেরা বলধা গার্ডেন দেখতে আসতেন। এখনো বলধা গার্ডেন নিয়ে ঢাকাবাসীর আগ্রহের কমতি নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলধা গার্ডেন পরিদর্শন করেছিলেন। তখন তিনি এ গার্ডেনের বহু বিদেশী ফুলের বাংলা নামকরণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই জয় হাউজে বসে এখানকার ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার বিখ্যাত ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেছিলেন।
‘কাঁটাতে আমার অপরাধ আছে
দোষ নাহি মোর ফুলে
কাঁটা অপ্রিয় থাক মোর কাছে
ফুল তুমি নিও তুলে।’
উদ্যানের দু’টি অংশ, সাইকী ও সিবলী। সাইকী অংশের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নীল, লাল, সাদা, হলুদ, জাতের শাপলায় ভরা অনেকগুলো শাপলা হাউজ, বিরল প্রজাতির দেশী বিদেশী ক্যাকটাস, অর্কিড, এনথুরিয়াম, ভূজ্জ পত্র গাছ, বিচিত্র বকুল, আমাজান লিলি ও সুরংগসহ একটি ছায়াতর ঘর।‘সাইকী’ উদ্যানটি গবেষণার কাজের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এই অংশে প্রবেশ নিষেধ।
সিবলী অংশের মূল আকর্ষণ হচ্ছে শঙ্খনদ, পুকুর, ক্যামেলিয়া, আশোক, আফ্রিকান টিউলিপস। এখানে আরো আছে সূর্যঘড়ি, জয় হাউজ। বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্য শুধু সিবিলী উদ্যান উন্মুক্ত রয়েছে।
উদ্যানের অন্যতম মূল আর্কষণ ছিল সূর্যঘড়ি। ঘড়িটার অবস্থান বলধা গার্ডেনের সিবলি (প্রকৃতির দেবী) অংশে। ১৯০৯ সালে বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে বলধা গার্ডেনের জৌলুশ বাড়ানো জন্য সূর্যঘড়ি স্থাপন করা হয়। এখানকার মাঝের রাস্তা বাগানটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। বাগানে ঢুকে এই রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলে হাতের বামে পড়বে শঙ্খনদ পুকুর। এই পুকুরের বিপরীত দিকেই রাস্তার সাথেই অবস্থান সূর্যঘড়িটির। পূর্ব দিকের সুউচ্চ ভবন আর গাছের অগোছালো ডালপালার জন্য সূর্যঘড়ির ওপর আলো আসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে এর কার্যকারিতা থেমে আছে। তাই আলোর অভাবে সকালে কাজ করে না শতবর্ষী বলধা গার্ডেনের সমবয়সী সূর্যঘড়িটি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য যখন মাথার ওপর উঠতে শুরু করে তখনই কেবল সক্রিয় হয় সময় দেখার প্রকৃতিনির্ভর এই প্রাচীন মাধ্যম। আবার বিকেল গড়ানোর আগেই গাছের ছায়া আর পশ্চিম দিকের অন্যান্য স্থাপনার কারণে উদ্যানের আলো দ্রুত মরে আসে। তাই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও বিকেল ৪টার পর ঘড়ির কার্যকারিতা আর থাকে না। আর কর্তৃপক্ষের অবহেলার জন্য সূর্যঘড়িটির রঙ উঠে মলিন হয়ে গিয়েছে।
বলদা গার্ডেনের শঙ্খনদ পুকুর
এ ছাড়াও দেখা যায় বেশ কয়েকটা বিশাল আকারের গাছের গুঁড়ি উদ্যানে পরে রয়েছে। এ বিষয়ে বাগানের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর জানান, ঝড়ের সময় প্রাচীন একটা ইউক্যালিপ্টাস গাছ ভেঙে পড়ে। উদ্যানের অন্যান্য গাছ রক্ষার জন্য সেই ভেঙে পড়া গাছ কেটে গুঁড়ি আকারে রাখা হয়েছে। মৃত গাছের বিপরীতে কী পদক্ষেপ নেয়া হয় জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, সে ক্ষেত্রে বনবিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী গাছের চারা বানিয়ে আবার গাছটি প্রতিস্থাপন করা হয়।
শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের জন্য এ বাগান উন্মুক্ত। সিবলী অংশ প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই উদ্যান দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।



