দুপুর পর্যন্ত ছেলের খবরের অপেক্ষায় আইসিইউর সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিলেন আবদুল মতিন। হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠেছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল আইসিইউর ভেতর থেকে এই বুঝি বাবা বলে ডাকছে আদরের সন্তান। কিন্তু না সুহার্তো আর ডাকেনি। কিছুক্ষণ পর যখন বাবার কোলে ফিরেছে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন (সুহার্তো) তখন সে কেবলই লাশ। ১৮ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরের গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হয় সুহার্তো। ডান চোখের পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে তার মস্তিষ্ক ছিদ্র করে চলে যায়। সুহার্তো যেদিন গুলিবিদ্ধ হন সেদিন ঢাকা ছিল উত্তাল। মিরপুর, মহাখালী, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মোহাম্মদপুরে ব্যাপক সঙ্ঘাত চলছিল।

মিরপুরে খালার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন সুহার্তো। সেখানেই খালাতো ভাই এবং তার বন্ধুদের সাথে আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। বিকেলের দিকে গুলিবিদ্ধ হন সুহার্তো। সেখানে তার আন্দোলন সহযোদ্ধারা আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মিরপুরের আলোক হাসপাতাল পরে আরেকটি হাসপাতালে নেয়। শেষে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্টে দু’দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ২০ জুলাই দুপুরে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
সুহার্তোর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে গানশট ইনজুরির কথা উল্লেখ করা হয়। বুলেট মাথায় আঘাত করার কারণে সেকেন্ডারি ব্রেইন ইনজুরি হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তার বাবা আবদুল মতিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, মিরপুর ১০-এর গোলচত্বরে ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন ১৯ বছরের সুহার্তো। পরে শাহবাগ থানায় জিডি করেন তিনি। ময়নাতদন্ত শেষে ২১ জুলাই রোববার রাতে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কুমড়াশাসন উত্তরপাড়া গ্রামে আনা হয় লাশ। ২২ জুলাই সকাল ১০টায় নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হয় বাড়ির পাশের কবরস্থানে।
একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে নির্বাক মা মমতাজ বেগম। কিংকর্তব্যবিমূঢ পিতা আব্দুল মতিনের চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। ভাইকে হারিয়ে যেন বোবা হয়ে গেছে সব সময় হাসিখুশি থাকা ছোট বোন স্মাইল। ঘুমের ঘোরে আজো ছেলের নাম ধরে ডেকে উঠছেন সুহার্তোর মা।

বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আব্দুল মতিন। স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে থাকেন ঢাকা বিশ্বরোডের পাশে কুড়ালতলিতে। তবে সুহার্তো পড়তেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজে। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। পাঁচটি পরীক্ষা দেয়ার পর আন্দোলনের কারণে স্থগিত হয়ে যায়। এই সুযোগে ঢাকায় গিয়েছিলেন বাবা-মার কাছে। মতিন বলেন, ওই দিন মিরপুরে খালার বাসায় গিয়েছিলেন সুহার্তো। সেখানেই খালাতো ভাই এবং তার বন্ধুদের সাথে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন একপাশে ছিল আন্দোলনকারী; অপর পাশে পুলিশ ও ছাত্রলীগসহ যুবলীগ, আওয়ামী লীগ।
শোকাহত মতিন বলছিলেন, সুহার্তোর মৃত্যুর পর লাশ পেতে শুরু হয় আরেক ভোগান্তি। পুলিশের ছাড়পত্র ছাড়া লাশ দিতে চাইছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল থেকে বলা হয়, যেখান
কার ঘটনা সেখানকার ‘পুলিশের সার্টিফিকেট’ ছাড়া লাশ দেয়া যাবে না। শুরু হয় লাশ পাওয়ার যুদ্ধ। সুহার্তোর লাশ তখন মিরপুর মডেল থানায়। সেখানে পুলিশের হাতে-পায়ে ধরেন তিনি, কিন্তু তারা কথা কেউ তখন শুনতে চায়নি। এর মধ্যে কেউ একজন প্রশ্ন তোলেন, ঢাকায় এত গণ্ডগোল হচ্ছে, আপনার ছেলে যে মিরপুরেই মারা গেছে, তার প্রমাণ কী? ওই অবস্থায় মতিন আবার ফিরে আসেন হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্মকর্তাদের বলেন, মিরপুর থানা পুলিশ তো সার্টিফিকেট দিচ্ছে না। তখন সেখানে থাকা কেউ একজন শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আসার পরামর্শ দেন। অনেক প্রশ্নের পর শাহবাগ থানা জিডি নেয়। সেই কাগজ নিয়ে মর্গে যান মতিন। অবশেষে লাশ দেয়া হয়। কথাগুলো বলার সময় মতিনের কণ্ঠ যেন আড়ষ্ট হয়ে আসে।

একটু থেমে মতিন আবার বলতে শুরু করলেন, ছেলেকে ঘিরে তৈরি হওয়া স্বপ্ন ভেঙ্গেচুরে ধুলায় মিশে গেছে। আমি এখন শুধু ছেলে হত্যার বিচার চাই। মতিন বলেন, ছেলে হারানোর শোক আর বইতে পারছেন না তিনি। চোখে বারবার ভেসে ওঠে ছেলের মুখ, তার স্মৃতি।
আবদুল মতিন আরো জানান, তার পক্ষে আইনজীবী মো: আসাদ উদ্দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় শেখ শাহরিয়ারকে হত্যার অভিযোগ এনে গত ২১ আগস্ট একটি অভিযোগ দাখিল করেছেন। আবেদনে শেখ হাসিনা, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাবেক মেয়র আতিকুলসহ ৫২ জনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অজ্ঞাতনামা ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।
এ দিকে সুহার্তো হত্যার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার উপপরিচালক (প্রশাসন) আতাউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মিরপুরের সঙ্ঘাতের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী শেখ শাহরিয়ারের বাবা বাদি হয়ে দাখিল করা অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে।