অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পতনই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজারের। কোনো কারণ ছাড়াই প্রতিদিন পতন ঘটে চলেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের। পতন থামাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নেয়া উদ্যোগে সাময়িকভাবে পতন থামলেও আবার ধারাবাহিক পতনেই ফিরে যাচ্ছে বাজার। গত দশটি কর্মদিবসের মধ্যে মাত্র একটিতে বাজার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বাকি নয়দিনই অবনতি ঘটেঝে সূচকের। বাজার বিশ্লেষকরা অর্থনীতির মন্দাভাবকে সূচকের পতনের জন্য দায়ী করলেও তারা বাজারে এ ধারাবাহিক পতনের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ প্রতিদিনের দরপতনে পুঁজি হারিয়ে ক্রমান্বয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বাজারের বিনিয়োগকারীরা। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে আশ^স্ত করা হলেও তাতেও পতন থামছে না বাজারের।  
পুঁজিবাজারের নেতিবাচক প্রবণতা থামাতে সাম্প্রতিক সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও ব্রোকার হাউজগুলোর সংগঠন ডিবিএ। বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংস্থা ও সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয় যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি আইসিবির সুবর্ণ জয়ন্তি ও বিশ^ বিনিয়োগকারী সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে তার সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন যার মাধ্যমে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। থেমে যাওয়ার কথা বাজারের ধারাবাহিক এ পতন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রতিদিনই পতন ঘটছে পুঁজিবাজার সূচকের। 
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৬ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৪৮২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৪৪৫ দশমিক ২৮ পয়েন্টে। একই সময় পুঁজিবাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫৩ ও ৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট। এর আগে রোববার ডিএসইর প্রধান সূচকের পতন ঘটে ৪৯ দশমিক ২৮ পয়েন্ট। 
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৪০ দশমিক ২১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৪ হাজার ৬৬০ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি সোমবার বিকেলে লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৬২০ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ৫ দশমিক ১৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও সিএসসিএক্স সূচকটির অবনতি ঘটে ৩২ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট।
গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান প্রধান ১২টি খাতের মধ্যে মাত্র তিনটি খাতে ইতিবাচক আচরণ দেখা যায় বাকি ৯টি খাতেই দরপতনের ঘটনা ঘটে। মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাত। এ খাতের কোম্পানি এপেক্স ফুডসের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে পুরো খাতটিতে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়। বাকি দু’টি খাতের মূল্যবৃদ্ধি ছিল নামমাত্র। অপর দিকে টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, বীমা, চামড়া শিল্প, প্রকৌশল ও বিবিধ খাতে ব্যাপক দরপতন ঘটে গতকাল। দিনশেষে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৬টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ৫৪টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৮৪টি যা লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের প্রায় ৭৪ শতাংশ। এ সময় বাজারটিতে দর অপরিবর্তিত ছিল  ৪৮টি সিকিউরিটিজের। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টকে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৯৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৫৩টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দরপতন ঘটে ১২০টির। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল ২২টি সিকিউরিটিজের। 
এ দিকে দেশের পুঁজিবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি। বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রাথমিক গণপ্রস্তবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত হতে চায় কনফিডেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি। এই পদ্ধতির আইপিওর শর্ত হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী ১৮ অক্টোবর রোড শোর আয়োজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে কোম্পানিটি আইপিওর প্রসপেক্টাস প্রকাশ করেছে।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি মূলত বিদ্যুৎ ব্যবসায় নিয়োজিত কোম্পানি। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে এই কোম্পানির ব্যবসা। ২০১৭ সালে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। আর ২০২৪ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২৫০ টাকা, আর পরিশোধিত মূলধন (আইপিও-পূর্ববর্তী) হচ্ছে ১৪৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। 
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি একটি হোল্ডিং কোম্পানি। এর অধীনে চারটি সহযোগী কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেড, জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেড ও কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড। প্রথম তিনটি কোম্পানি ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে। কোম্পানি তিনটির মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড ও কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেডের উৎপাদনক্ষমতা ১১৩ মেগাওয়াট করে ২২৬ মেগাওয়াট। জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেডের উৎপাদনক্ষমতা হচ্ছে ৫৪.৩৬ মেগাওয়াট।
অপর দিকে কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেড হচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার ও ডোরিন পাওয়ারের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি। চলতি বছর প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার বিষয়ে সরকারের সাথে একটি ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পটি নির্মাণাধীন আছে।
সহযোগী কোম্পানিগুলোর মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর লিমিটেড ও জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেডের ৯৯.৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। অন্য দিকে কোম্পানিটি কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেডের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। আইপিওর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহহ করে উত্তোলিত তহবিলের একটি অংশ কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, কনফিডেন্স ডরিন পাওয়ার লিমিটেডে ইক্যুইটি বিনিয়োগ ও ঋণের একাংশ পরিশোধে ব্যবহার করবে কোম্পানিটি।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির আইপিওর ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্বে আছে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ইস্যু রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করছে প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি। সর্বশেষ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষক ছিল এ কাশেম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট।