দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গৃহদাহ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। জোট প্রার্থীর নৌকা ডুবাতে লড়াইয়ে নেমেছেন আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ নেতা। তারা অবস্থান নিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে। দলের শীর্ষ এসব নেতা ও তাদের অনুসারীরা নৌকার পক্ষে নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে জেতাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। এ কারণে এখন প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন নৌকার সমর্থকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অবমূল্যায়ন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর স্থানীয় প্রভাব এবং কারো বিরাগভাজন হতে না চাওয়ায় তৃণমূল আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষনেতা নৌকাকে সমর্থন দেয়ার প্রশ্নে নীরব রয়েছেন। আবার অনেকে প্রকাশ্যে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নানা সমালোচনাও করছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করে বক্তব্য দিচ্ছেন। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, সঙ্ঘাতের আশঙ্কা ততই বাড়ছে। অবস্থা এখন একেবারে লেজেগোবরে। লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগও এ ব্যাপারে চুপ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে এবার ৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও নৌকা প্রতীক পান ফরিদুন্নাহার লাইলী। জোটকে কৌশলগত কারণে আসনটি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তে ফরিদুন্নাহার লাইলী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। তার জায়গায় দলীয় মনোনয়ন পান জাসদের মোশারফ হোসেন। অন্য দুই প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের যাচাইয়ে বাতিল হলে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয় ছয় প্রার্থীকে। এদের মধ্যে ১৪ দলের প্রার্থী মোশারফ হোসেনকে নৌকা, স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্কান্দার মির্জা শামীমকে ট্রাক, আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ঈগল, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোহাম্মদ সোলায়মানকে একতারা, মাহমুদা আক্তারকে তবলা ও আব্দুস সাত্তারকে রকেট প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়।
এ দিকে দলটির রামগতি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ, রামগতি পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মেজু, কমলনগর উপজেলা সভাপতি নিজাম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ হোসেন রাসেলসহ বেশ কিছু নেতা নৌকার পক্ষে থাকলেও দুই উপজেলা ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনের ৫০ জনেরও বেশি শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করছেন। তারা হলেন- রামগতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ মুরাদ, সহ-সভাপতি ড. আশ্রাফ আলী চৌধুরী সারু, চরআলগী ইউপির চেয়ারম্যান জাকির হোসেন লিটন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা ও চরগাজী ইউপির চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন, বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান মাকছুদ মিজান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু নাছের, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেছবাহ উদ্দিন ভিপি হেলাল, যুগ্ম আহ্বায়ক শোয়াইব খন্দকার, রাহেদ বিপ্লব, কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জহির উদ্দীন ভুঁইয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাহেবেরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার আবুল খায়ের, কমলনগর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন বাপ্পি, যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান উল্লাহ হিরন, চরকাদিরা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আশ্রাফ উদ্দিন রাজুসহ দুই উপজেলার সব ক’টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ জনের অধিক নেতা এখন নৌকার প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে তৎপর রয়েছেন।
তারা জানান, তাদের নৌকা অল্প কিছু দিনের জন্য জাসদের লোকের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে। অপর দিকে আব্দুল্লাহ আল মামুন দলীয় লোক। সুখে দুখে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা নেতার বিকল্প নেই।
এ দিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই নেতা জানান, কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নিজাম উদ্দিন ও চরকাদিরা ইউনিয়ন সভাপতি নুরুল ইসলাম নৌকার পক্ষে সক্রিয় দেখালেও গোপনে তারাও স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে একাট্টা। এতে আওয়ামী লীগের তৃর্ণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরাও হতাশ। তৃর্ণমূল কর্মীরাও এখন চুপচাপ হয়ে আছেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে নৌকার বিজয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকেই।
কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন রাজু বলেন, নৌকার প্রার্থী পরিবর্তন দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। দল যাকে নৌকা দিয়েছে তাকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
রামগতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ মুরাদ বলেন, আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পক্ষে। তার জন্য দলের নেতাকর্মীরা এক হয়ে কাজ করবে। আমরা কারো পক্ষে ভাড়া খাটতে রাজি নই। নৌকা কয়েক দিনের জন্য জোটকে দেয়া হয়েছে, কিন্তু আমরা দলীয় ব্যক্তিকে এমপি নির্বাচিত করতে চাই।
রামগতি পৌরসভার মেয়র এম মেজবাহ উদ্দিন মেজু বলেন, নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যারা নৌকার বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট করছেন, তারা নেত্রীর ও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে চলে গেছে। সময় মতো দল তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। গুটিকয়েক লোকের কারণে নৌকার বিজয়ে কোনো বাধা হবে না।
স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য নির্বাচনী মাঠ উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।
নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বলেন, এমপি থাকাকালীন জনগণের জন্য কাজ করেছি। ১৪ দলীয় জোট থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আমি নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করছি। আমি জয়লাভ করলে রামগতি ও কমলনগরে মেঘনার ভাঙন রোধসহ উন্নয়নমূলক কাজ করে যাবো।
লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুদ্দীন চৌধুরী নয়ন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যার হাতে নৌকা তুলে দিয়েছেন, সবাই তার পক্ষে কাজ করতে হবে। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন- এখন যারা নৌকার বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট করছেন তারা প্রধানমন্ত্রীকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস কোথায় পেলেন? নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে অচিরেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।